মহাবিশ্বের আদিতে ঘুমিয়ে থাকা ‘স্লিপিং বিউটি’ গ্যালাক্সি খুঁজে পেল জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ
📍 বিজ্ঞান ও মহাকাশ ডেস্ক | জুলাই ২০২৫
বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথম এক বিলিয়ন বছরের মধ্যেই এমন ডজনখানেক গ্যালাক্সি চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলো হঠাৎ করেই থেমে গেছে—তারা আর নতুন কোনো নক্ষত্র তৈরি করছে না। এই ‘ঘুমন্ত গ্যালাক্সিগুলোর’ সন্ধান মিলেছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-এর মাধ্যমে, যা মহাবিশ্বের শুরুতে গ্যালাক্সির বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
এই গবেষণা এখনো পর্যালোচনার অপেক্ষায় থাকলেও ২০২৪ সালের একটি প্রকাশনায় প্রথমবারের মতো মহাবিশ্বের আদিতে একটি ঘুমন্ত গ্যালাক্সি চিহ্নিত করার বিষয়টি আলোচিত হয়।
গ্যালাক্সি নতুন নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়া হঠাৎ থামিয়ে দিলে তাকে ‘Dormant’ বা ঘুমন্ত গ্যালাক্সি বলা হয়। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে:
- সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল: এরা তীব্র বিকিরণ ছড়িয়ে শীতল গ্যাসকে উত্তপ্ত করে ফেলতে পারে, যা নক্ষত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য।
- প্রতিবেশী বৃহৎ গ্যালাক্সির প্রভাব: বড় গ্যালাক্সিগুলো ছোট গ্যালাক্সির গ্যাস কেড়ে নিতে পারে।
- তীব্র নাক্ষত্রিক প্রতিক্রিয়া (stellar feedback): সুপারনোভা, নাক্ষত্রিক ঝড় ও আলোচাপের ফলে গ্যাস গরম হয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে।
এইসব কারণে কিছু গ্যালাক্সি সাময়িকভাবে নতুন নক্ষত্র তৈরি বন্ধ করে দেয়—একে বলা হয় “নক্ষত্রীয় বিরতি“ বা bursty star formation।
গবেষণার প্রধান গবেষক আলবা কোভেলো পাজ, ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার একজন ডক্টরাল শিক্ষার্থী, জানান:
“আমরা JWST-এর NIRSpec স্পেকট্রোস্কোপিক ডেটা বিশ্লেষণ করে ১,৬০০ গ্যালাক্সির আলো পর্যবেক্ষণ করি। এর মধ্যে আমরা এমন ১৪টি গ্যালাক্সি খুঁজে পাই, যেগুলোর মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ২৫ মিলিয়ন বছর ধরে কোনো নতুন নক্ষত্র তৈরি হয়নি।”
এই গ্যালাক্সিগুলোর ভর ছিল ৪০ মিলিয়ন থেকে ৩০ বিলিয়ন সৌর ভরের মধ্যে—যা দেখায়, শুধুমাত্র ক্ষুদ্র বা বিশাল গ্যালাক্সিই নয়, মাঝারি ধরনের গ্যালাক্সিও ঘুমন্ত অবস্থায় যেতে পারে।
পাজ বলেন, “আগে মনে করা হতো, মহাবিশ্বের শুরুতে গ্যালাক্সিগুলো প্রচুর নক্ষত্র তৈরি করছিল। তাই এই ঘুমন্ত গ্যালাক্সিগুলোর উপস্থিতি আমাদের অবাক করেছে।”
গবেষকদের মতে, এই ঘুমন্ত অবস্থা স্থায়ী না–ও হতে পারে। অনেক সময়, নিক্ষিপ্ত গ্যাস আবার ফিরে আসে এবং ঠাণ্ডা হলে নতুন নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়।
তবে কেউ কেউ সতর্ক করে বলছেন—যদি এই গ্যালাক্সিগুলো দীর্ঘ সময় (৫০ মিলিয়ন বছরের বেশি) ঘুমন্ত থাকে, তাহলে হয়তো তারা আর কখনোই জেগে উঠবে না—অর্থাৎ, তারা পুরোপুরি “মৃত” গ্যালাক্সিতে রূপ নিতে পারে।
এই ঘুমন্ত গ্যালাক্সিগুলোর আরও গভীর অনুসন্ধানের জন্য JWST-এর পরবর্তী গবেষণা প্রকল্প “Sleeping Beauties” নামে চালু হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হবে:
- ঘুমন্ত গ্যালাক্সিগুলোর সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা
- কতদিন ধরে তারা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে, তা নির্ধারণ করা
- কীভাবে তারা আবার নক্ষত্র তৈরি শুরু করতে পারে, তা বোঝা
নতুন এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের ইতিহাসে গ্যালাক্সির বিবর্তন সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
JWST-এর মাধ্যমে পাওয়া এই গভীর দৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছে, নক্ষত্র জন্মদানও হয় থেমে থেমে, এবং মহাকাশের অনেক গ্যালাক্সিই ঘুমিয়ে আছে সময়ের এক রহস্যময় জগতে।
গবেষক পাজ বলেন,
“এখনো অনেক কিছুই অজানা, তবে আমরা এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছি এই রহস্য উন্মোচনে।”
📚 তথ্যসূত্র:
- LiveScience
- JWST DAWN আর্কাইভ
- arXiv প্রিপ্রিন্ট (২৭ জুন ২০২৫)
- University of Geneva
লেখক: লিটন হোসাইন জিহাদ

Responses