“আর্থিক দারিদ্র্য থেকে কৃষকের মুক্তির উপায়: নিজের উৎপাদন নিজেই গড়ে তোল”

লিটন হোসাইন জিহাদ: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড, কিন্তু তারা আজ হারিয়ে যাচ্ছে অবমূল্যায়নের ল্যাবরিতে। জীবনের লড়াইয়ে তারা ভাট্টার মুখ দেখেন—পাঁচ বিঘা জমিতে আলু উৎপাদন করে ১৫ টাকা কেজি বিক্রি করেন, আর সেই অর্থে বাজার থেকে কিনতে হয় সয়াবিন তেল ১৮০ টাকা কেজিতে। মূল্যের এ বিশাল ফাঁক শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি আর্থ-সমাজব্যবস্থার সমালোচনা। এ দেশের কৃষকদের ৮৫ % ছোট খামারি (smallholder) হিসেবে ভূমিতে কাজ করে, অথচ উৎপাদনের স্বারগীয়তায় তারা নাজেহাল। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত কৃষকদের আয় উৎসের ভিন্নতার চিত্র শিক্ষনীয়—কৃষি, মজুরি ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের সবকিছু মিলিয়ে, কৃষিকাজ শুধুমাত্র সুবিধা নয়, বরং সকল অর্থনীতি-সংক্রান্ত বৈষম্যের মূল চালক ।
প্রক্রিয়ায় কৃষকের ফসল সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা (পাইকার, আড়তদার) আরোপ করে মূল্যের ন্যায্য ভারসাম্য। ফলে উৎপাদক কৃষকের আয় অপুষ্টিকর এবং অনিশ্চিত। শুধু তাই নয়, বছরের পর বছর বিদ্যুত, সার, বীজ, কীটনাশক—সবকিছুতেই টাকা বেশি লাগে, কিন্তু পণ্যের মূল্য ততটা উঠেনা। ভিটে-মাটি, শ্রম, ফসল—সব্বাই অকৃত্রিম হয়ে যায়।
এবার ভাবুন, আপনি যদি স্বাধীন হন—অর্থাৎ “নিজের প্রয়োজন নিজেই মেটান”—এটি শুধু ব্যক্তিগত প্রোভিশন নয়, বরং একটি আত্মনির্ভর কৃষি দর্শন। আপনার পাঁচ শতক জমিতে সরিষা চাষ করলে বাজার থেকে তেল কেনার প্রয়োজন কমে; দুই শতক জমিতে দেশি মুরগি ও ছাগল রাখলেও পুষ্টি ও আয় উভয়ই বাড়ে। পাশাপাশি পাশেই তৈরি করা পুকুরে দেশি মাছ ও হাস ছাড়া অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসতে পারে। এতে উন্নত বা বাজারনির্ভর মডেল না মিনিয়ে, প্রাকৃতিক সম্পদ ও নিজস্ব চেষ্টায় নিজেকে ছাড়া যায়।
কিন্তু এই দর্শন বাস্তবে পৌঁছাতে হলে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগত সহায়তা জরুরি। বাংলাদেশের কৃষকদের প্রাধান্য এমনভাবে তৈরি করা উচিত যেন তারা সহজেই বাজার, তথ্য, ঋণ ও প্রযুক্তি পাচ্ছে। FAO ও GAFSP এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন—বিশেষভাবে ডিজাইন করা কৃষক-সংগঠন (Producers’ Organizations) গড়ে তোলার মাধ্যমে ঋণ, বাজার ও প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধি এনে প্রায় ৩৫ % পর্যন্ত আয়ের বৃদ্ধি সম্ভব । একtez পদ্ধতিতে шилেকের মতো প্রকল্পে ১১ হাজার ক্ষুদ্র কৃষকের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে, কৃষকদের লাখ লাখ সদস্যকে আধুনিক প্রযুক্তি ও শিক্ষা দেয়া হলে ঝুঁকি কম এবং আয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে এই ব্যবস্থাপনা পুরোটাই উপলব্ধ নয়। বাংলাদেশের কৃষি এখনও বাকি রয়ে গেছে ঐতিহ্যবাদী, প্রযুক্তিহীন ও অসংগঠিত। বোরো বা আমন চালসহ প্রধান ফসলের উৎপাদনে মেকানাইজেশন ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া হয়নি। ফলে বছরে বারোটা বছরই কৃষক নির্ভর করে দুর্যোগ, এমনকি এমন দুর্যোগ যা নদীর বন্যা, টানা তাপপ্রবাহ বা খরা—এগুলো ক্ষতি করে ফসল এবং কৃষকের আয়কে ভেঙে ফেলে
ফসল হারিয়ে যায়, তাহলে কী? একদিকে সরকারি নির্বাচন ছাড়া বেশি মাত্রায় ক্ষতিপূরণ নেই, অন্যদিকে মুদ্রকালে সিরিজ ভর্তুকি নেই। এভাবেই বাংলাদেশের কৃষি ঝুঁকির খেলায় পড়েছে। ২০২৪ সালে চলতি বর্ষায় বন্যায় ধ্বংস হয়েছে প্রায় ১.১ মিলিয়ন টন চাল, যার ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ বিলিয়ন টাকা (৩৮০ মিলিয়ন USD) করে । এতে কৃষকের আয় কমে যায়, মার্জিন নষ্ট হয়, আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়।
প্রকৃতপক্ষে, কৃষকদের মুক্তির পথ কোনো রূপক নয়—it is integration between policy, technology and grassroots initiative। কৃষক যখন নিজেই সরিষা তেল উৎপাদন, মুরগি ও ছাগল পালন, পুকুরে মাছ-কৃষির মাধ্যমেই নিজেকে অটোনমাস করে তুলে—তার মানেই একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সামাজিক শক্তি প্রতিপন্ন হয়।
তবে এ দর্শন কেবল ব্যক্তিগতভাবে স্থাপন করলে চলবে না। সরকারের উচিতള്ള micro-credit কার্যক্রম (যেমন: ‘একটেবাড়ি একটেখামার প্রকল্প’) চালিয়ে ජනসাধারণকে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, যেমন ২০০৯ সালের থেকে ২১.৮ মিলিয়ন মানুষকে একটির মাধ্যমে আয়েসকৃত উন্নয়ন প্রতিষ্ঠিত করেছে । এ প্রোজেক্টের দরুণ গ্রামীণ পরিবারগুলো নিজের ফার্ম ভিত্তিক উৎপাদন ও আয়-উন্নয়ন করতে পেরেছে।
এ ছাড়া FAO ও GAFSP সহায়তায় গড়ে উঠা कृषক সংগঠনগুলো স্থানীয় স্তরে বাজার, প্রযুক্তি ও ঋণের তিনটি রূপায়নযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে পারে—যাতে কৃষকদের ‘missing middle’ অর্থায়ন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে সুন্দরভাবে value chain এ যুক্ত হওয়া যায়
কৃষিকাজে বৈচিত্র্য (crop diversification) একটি শক্তিশালী কৌশল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। MS Islam এক গবেষণায় দেখিয়েছেন—পদ্মার আশেপাশে বৈচিত্র-based cropping households average income বাড়িয়েছে এবং পরাভূতির ঝুঁকি কমিয়েছে
অতএব আপনার প্রবন্ধের মূল ভাবনা—”নিজের প্রয়োজন নিজে মেটাও” এক দার্শনিক বক্তব্য নয়, সেই চিন্তার ভিত্তি যেখানে কৃষক তার আয়, নিজস্ব নিরাপত্তা ও গৌরব নিজের হাতে গড়ে তোলে। কিন্তু এর সফল বাস্তবায়নে রাষ্ট্র, সম্প্রদায় ও প্রযুক্তি—এই তিনটি স্তম্ভ একসাথে কাজ করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে “দেশজ উৎপাদন ও ধরে রাখার ভাবনা,” যেমন—পুকুর খনন, ফসল বৈচিত্র্য, দেশি পোলট্রি, দেশি মৎসচাষ—সবই আজকের কৃষকের জন্য একান্ত প্রয়োজন।
এই একটি ব্যক্তির চেষ্টাই পর্যাপ্ত নয়; এটি উচিত সামাজিক আন্দোলন, নীতি বাস্তবায়ন ও প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের ফলে একটি টেকসই কৃষি দর্শনে রূপান্তরিত। কৃষকের ঘরে নিজের ভ্রূণের যত্ন, নিজের কাঠের তেল, নিজের মুরগি ও মাছ—এর মাধ্যমে সে আজ গর্ব করে বলতে পারুক: “আমি নিজের পিছু হাঁটাই, আমি কারো করুণা প্রার্থনা করি না।” এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ যদি বাকি দিকগুলো সমর্থন করে, তাহলো বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লব সম্ভব হয়ে উঠবে—তখনই সত্যিকারের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

Responses