ইন্টারনেট ব্যবহারে কি মানুষ বেশি ভালো থাকে? থাকে—শুধু অল্পবয়সি মেয়েরা বাদে: গবেষণা

অনলাইন ডেস্ক:  প্রতিদিন পার্কে হাঁটলে আমাদের মনে ভালোলাগার যে অনুভূতি হয়, রোজ ইন্টারনেট ব্যবহারেও ওই একইরকম ভালো থাকার অনুভূতি হয়। এমনটাই বলছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অভ টিলবার্খের দুই গবেষক অ্যান্ড্রু প্রিজিবিলস্কি ও ম্যাটি ভ্যুরে।

তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই, তাদের চেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকা মানুষ নিজেদের জীবন নিয়ে ৮ শতাংশ বেশি সন্তুষ্ট।

সংবাদমাধ্যম এল পাইসকে ভ্যুরে বলেন, ‘পার্কে হাঁটতে যাওয়া এবং না যাওয়া মানুষদের মধ্যে সুখী হওয়ার যতটুকু তফাত, ইন্টারনেট ব্যবহার করা এবং না করা মানুষদের সুখী হওয়ার তফাতও ঠিক ততটুকুই।’

তবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যেসব নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তারা তুলনামূলক কম সুখী হন বলে উঠে এসেছে সম্প্রতি ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত তাদের গবেষণায়।

ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ কীভাবে মানুষের ভালো থাকার ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে এটিই প্রথম বৃহৎ পরিসরের গবেষণা। এ গবেষণায় ১৬৮টি দেশের ২.৪ মিলিয়নের বেশি মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ম্যাটি ভ্যুরে বলেন, তাদের গবেষণাটি নতুন। কারণ, এর আগে এ-সংক্রান্ত যতগুলো গবেষণা হয়েছে, তার সবই হয়েছে ছোট পরিসরে এবং ইংরেজিভাষী পশ্চিমা দেশগুলোতে।[ads-shortcode ads_id=2772]

বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ জিডব্লিউপি ওয়ার্ল্ড পোল-এর ২০০৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চালানো এক জরিপ থেকে তথ্য নিয়েছেন গবেষকরা।

এ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বাড়িতে তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না; মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না; সর্বশেষ সাত দিনে তারা মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা অন্য কোনো ডিভাইস থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন কি না।

অংশগ্রহণকারীরা ‘ভালো’ বা ‘সুখে’ আছেন কি না, তা জানার জন্য গবেষকরা আটটি সূচক ব্যবহার করেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—নিজেদের জীবন নিয়ে তারা কতটা সন্তুষ্ট, ইতিবাচক ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা, সামাজিক সম্পর্ক, শারীরিক সুস্থতা, নিজেদের বাসস্থানে তারা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারছেন, এবং কর্মক্ষেত্রে তারা কতটা উজ্জীবিত।

See also  ভারতে বহুতল ভবন ধস, অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

গবেষকরা প্রথমে দেখেছেন ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকা বা না-থাকায় মানুষের ভালো থাকা কীভাবে বদলে যায়। এরপর গবেষকরা তাদের প্রাপ্ত তথ্যগুলো কতটা নিরেট, তা খতিয়ে দেখেন। এ উদ্দেশ্যে তারা ৩৩ হাজার ৭৯২ উপায়ে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেন। প্রায় ৩৪ হাজার উপায়ের বিশ্লেষণে ৮৪.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া গেল—ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ও ভালো থাকার মধ্যে সম্পর্ক আছে।

এসব ফল বলছে, ইন্টারনেট ব্যবহার ও ব্যবহারের সুযোগ পেলে ভালো তুলনামূলক বেশি ভালো থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এরপর যাচাই করে দেখলেন, ইন্টারনেট ব্যবহারে সুখে থাকার ওপর অন্য কোনো কারণ প্রভাব ফেলে কি না। অর্থাৎ আনুষঙ্গিক কোনো কারণের সুবাদে ইন্টারনেট ব্যবহার করে বেশি ভালো থাকা যায় কি না। এজন্য তারা বহুবার বহু উপায়ে জরিপ চালালেন। প্রতিবার জরিপের সময় কিছু জিনিস বদলে দিলেন তারা। উদ্দেশ্য, ছিল এসব ফ্যাক্টর বদলে দেওয়ার পরও ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে সুখের এই সংযোগ থাকে কি না। দেখা গেল, শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারেই মানুষের ভালো থাকার হার বাড়ছে, এর সঙ্গে অন্য কোনো অনুঘটকের প্রয়োজন পড়ছে না।

তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, সিংহভাগ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ভালো থাকার প্রমাণ মিললেও একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমার (১৪-২৫ বছর) নারীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে খারাপ থাকার কথা জানিয়েছেন।

আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে সাইবার বুলিং বাড়ছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও বিষণ্ণতার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।

ইন্টারনেট ব্যবহার ও ভালো থাকার গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না মনোবিজ্ঞানী আন্দ্রিয়া ভিজকাইনো কুয়েনকো। তিনি বলেন, অল্পবয়সি নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার করে খারাপ থাকার কারণ হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তিনি বএন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী তরুণীরা নিজেদেরকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন বেশি। অন্যদের সযত্নে বাছাই ও এডিট করা ছবি দেখে নিজেকে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা জন্মায়, তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। প্রতিনিয়ত সৌন্দর্যের অবাস্তব মানদণ্ডের মুখোমুখি হলে নারীরা মানসিকভাবে ভালো থাকেন না।

See also  ভারতে বহুতল ভবন ধস, অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

এই বয়সি নারীদের ভালো থাকার অবস্থা বুঝতে অংশগ্রহণকারীদের দুটি প্রশ্ন করা হয়—তারা যে শহরে থাকেন সেটি নিখুঁত কি না এবং গত ১২ মাসে তারা তাদের এলাকার অবস্থা উন্নয়নের জন্য কিছু করেছেন কি না। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মেয়েরা জানান, তারা নিজেদের বসবাসের এলাকা নিয়ে খুশি না। প্রিজবিলস্কি বলেন, নিজের এলাকায় বৈরী পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন বলে মনে করা মানুষ অনলাইনে বেশি সময় কাটানোর কারণে এটি হতে পারে।

ভিজকাইনো বলেন, সাইবার বুলিং অল্পবয়সি অল্পবয়সি মেয়েদের ওপর ‘গুরুতর’ প্রভাব ফেলে। যেমন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, স্পেনে ৩ শতাংশ ১৫ বছর বয়সি মেয়েরা বলেছে, তারা স্কুলে মাসে অন্তত দুই-তিনবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব ভয়ানক হতে পারে। বুলিংয়ের ফলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

ভিজকাইনো বলেন, এর ফলে মেয়েরা নিজের গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পুষতে পারেন। সেইসঙ্গে নিজেদেরকে তারা নিঃসঙ্গ ও নিজ গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, বর্তমানে প্রতি ছয়জনে একজন কিশোর-কিশোরী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। ২০২৩ সাল থেকে মেয়েদের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার হার ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশ হয়েছে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে মধ্যে এ হার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে।

নিজ গোষ্ঠীতে ভালো না থাকার অনুভূতির কারণে মেয়েদের ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ে নাকি উল্টোটা ঘটে—এ নিয়ে আরও গবেষণার করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।

প্রযুক্তির সঙ্গে ভালো থাকার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন যাপনের কথা কল্পনাও করা যায় না। এ গবেষণা দেখানোর চেষ্টা করেছে যে অনলাইনের সবকিছুই ক্ষতিকর নয়। ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অভ মাদ্রিদের অ্যাপ্লাইড সোশিওলজি বিভাগের অধ্যাপক রেবেকা কর্দেরো বলেন, ‘ইন্টারনেট খারাপ বা ক্ষতিকর—এই নেতিবাচক চিন্তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভালোভাবে ব্যবহার করলে যেকোনো জিনিসই আমাদের ভালো রাখতে পারে।’

See also  ভারতে বহুতল ভবন ধস, অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা জীবন নিয়ে মানুষের সন্তুষ্টি কমিয়েও দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মনে ভালো অনুভূতির সঞ্চার করতে পারে, এটি ব্যবহার বন্ধ করে দিলে ইতিবাচক আবেগ কমে যেতে পারে।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ এ গবেষণার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তাদেরই একজন মনোবিজ্ঞানী হোসে আন্তোনিও তামায়ো। তিনি বলেন, জিডব্লিউপি গ্লোবাল সার্ভে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল প্রমাণিত নয়। এছাড়া জরিপে ‘ভালো থাকার’ সংজ্ঞা আগেই নিজের মতো করে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা সঠিক না-ও হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের উত্তর সম্পূর্ণ সত্য না-ও হতে পার। কারণ, অতীতের ঘটনা তারা ভুলে যেতে পারেন; নিজের কাছে যেটি ভালো মনে হয়, তারা সেই উত্তর দিতে পারেন; অথবা অন্যরা যা মনে করে সেটিকেই ঠিক ধরে নিয়ে তাতে একমত জানাতে পারেন।

সূত্র: বিজনেস স্ট্যার্ন্ডাট

Skip to toolbar