খোলা আকাশের নিচে শপথ, নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত কোনো সরকার খোলা আকাশের নিচে শপথ নিতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যরাও দ্বিতীয়বারের মতো উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে শপথ গ্রহণ করবেন। সংসদ ভবনের সামনের সবুজ চত্বরে এমপি ও মন্ত্রিসভার একযোগে শপথ অনুষ্ঠানকে বিশ্লেষকরা দেখছেন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে।
জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা যেন হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে নানা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আয়োজন হয়েছে এই প্রাঙ্গণেই। মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে শুরু হয়েছিল উৎসবমুখর সমাবেশ, নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশ এবং ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ। সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদের অনুষ্ঠানেও সরকার প্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এ সময়ের রাজনৈতিক আবহে আরও কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে সংসদ ভবন এলাকাকে ঘিরে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদীর জানাজায় ছিল চোখে পড়ার মতো মানুষের ঢল। পরে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি এই প্রাঙ্গণকে রূপ দেয় জাতীয় শোক ও ঐক্যের প্রতীকে। তাঁর স্মরণে নাগরিক শোকসভাও অনুষ্ঠিত হয় খোলা আকাশের নিচে, সংসদ ভবনের সামনের সবুজ চত্বরে।
এবার সেই একই প্রাঙ্গণে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যরা শপথ নিতে যাচ্ছেন। তারেক রহমানর নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভাও শপথ নেবে সংসদ ভবনের সামনে। আগে যেখানে সংসদ সদস্যরা শপথ নিতেন ভবনের ভেতরে এবং মন্ত্রীরা শপথ নিতেন গণভবনে, সেখানে দীর্ঘদিনের সেই রেওয়াজ ভেঙে এবার উন্মুক্ত পরিবেশে আয়োজন করা হচ্ছে এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইন বিশেষজ্ঞ ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তন নয়; বরং জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির একটি প্রতীকী বার্তা। জনগণের সামনে, জনগণের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রীয় শপথ আয়োজন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান–এ খোলা আকাশের নিচে শপথ নিয়েছিলেন। তারও আগে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। সেই ধারাবাহিকতায় আবারও খোলা আকাশের নিচে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যেন ফিরে আসছে ইতিহাসের এক প্রতীকী অধ্যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ ভবনের সামনে এই শপথ অনুষ্ঠান কেবল একটি রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নতুন সময়ের ঘোষণাপত্র। জনগণের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন যুগের পথচলা।

Responses