জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অজ্ঞাত শহিদ শনাক্তে রায়েরবাজারে ১১৪ মরদেহ উত্তোলন, পরিচয় মিলেছে ৮ জনের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাতনামা শহিদদের পরিচয় শনাক্তে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রায়েরবাজার শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে মরদেহ উত্তোলন ও ফরেনসিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ কার্যক্রমে মোট ১১৪ জন অজ্ঞাত শহিদের মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে ৮ জন শহিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএ ও মেডিকেল ফরেনসিক টিম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শনাক্ত হওয়া শহিদরা হলেন—শহিদ ফয়সাল সরকার, শহিদ পারভেজ বেপারী, শহিদ রফিকুল ইসলাম (৫২), শহিদ মাহিম, শহিদ সোহেল রানা, শহিদ আসানুল্লাহ, কাবিল হোসেন এবং শহিদ রফিকুল ইসলাম (২৯)।
এর আগে রোববার (৭ ডিসেম্বর) থেকে মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। সিআইডি জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নিহত একাধিক নারী ও পুরুষ শহিদের অজ্ঞাতনামা মরদেহ রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে এসব শহিদের পরিচয় উদ্ঘাটনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশকে। মানবাধিকার ও মানবিক কর্মকাণ্ডে ফরেনসিক বিজ্ঞানে অবদানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফরেনসিক বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক ডা. মরিস টিডবল-বিনজকে এ কর্মযজ্ঞে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বাংলাদেশে এসে সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএ ও মেডিকেল ফরেনসিক টিমকে দুই দিনব্যাপী কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেন।
মোহাম্মদপুর থানার সাধারণ ডায়েরি ও তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পর বিজ্ঞ আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের অনুমতি দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী মোট ১১৪টি মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়।
ইউএনএইচআরসির সহায়তায় আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফন্ডেব্রিডারের নেতৃত্বে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মরদেহ উত্তোলন ও ফরেনসিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
প্রতিটি মরদেহ উত্তোলনের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন এবং ফরেনসিক চিকিৎসকরা ময়নাতদন্ত পরিচালনা করেন। পাশাপাশি সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ও কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
এ পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা শহিদদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্য থেকে ৯টি পরিবারের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে ইতোমধ্যে ৮ জন শহিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পুরো কার্যক্রম আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হয়েছে, যাতে মর্যাদা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত থাকে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিখোঁজ শহিদদের পরিচয় নির্ধারণ, পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূরীকরণ এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে।

Responses