নারীর শরীরের ‘মেডিক্যালাইজেশন’: চিকিৎসার ফাঁদে বন্দী নারীরা
সারা বিশ্বে যেমন নারীর শরীর, মন ও জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো ক্রমেই চিকিৎসা ও প্রযুক্তির আওতায় আসছে, বাংলাদেশেও একই পরিবর্তন দৃশ্যমান। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান জন্মদান, ঋতুস্রাব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত নারীর জীবনের নানা স্তর এখন ওষুধ, চিকিৎসা ও পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণে বন্দি।
এমনকি সৌন্দর্যের ধারণাকেও চিকিৎসাজনিত সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই প্রবণতিকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ‘মেডিক্যালাইজেশন’ বলা হয়। অর্থাৎ, যা স্বাভাবিক তা চিকিৎসা দিয়ে ‘সঠিক’ করার চেষ্টা।
বাংলাদেশে এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যেমন সিজারিয়ান অপারেশনের সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ যেমন পরীক্ষা, ওষুধ প্রয়োগ ও অপারেশন বাড়ছে।
যদিও সিজারিয়ান অপারেশন কখনও কখনও অপরিহার্য, তবে অপ্রয়োজনে এটি স্বাভাবিক করে তোলা চিকিৎসা বাণিজ্যের অংশ মাত্র। এতে নারীর শরীর ও মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মাসিক, মেনোপজ, যৌন ইচ্ছার পরিবর্তন—এসব স্বাভাবিক শারীরিক ঘটনা নিয়েও চিকিৎসাব্যবস্থা রোগ নির্ণয়ের চোখে দেখে। মাসিকের ব্যথা বা অস্বস্তিকে অসুখ হিসেবে ভাবা, মেনোপজকে ‘হরমোনের ঘাটতি’ বলে চিকিৎসার আওতায় আনা, যৌন ইচ্ছার স্বাভাবিক ওঠাপড়া ‘ব্যাধি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ওষুধ দেওয়া—এসবই তার প্রমাণ।
পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নারীদের ওপর চাপিয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ধাক্কা খেতে হয়। পুরুষদের জন্য সহজলভ্য বিকল্প না থাকা এই অবস্থা আরও জটিলতা সৃষ্টি করে।
নারীর দেহের গঠন ও ওজনকেও ‘রোগ’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য ডায়েট পিল বা সার্জারি প্রমোট করা হয়, অথচ দারিদ্র্য, মানসিক চাপ বা জিনগত কারণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কসমেটিক সার্জারি যেমন ল্যাবিওপ্লাস্টি, ব্রেস্ট অগমেন্টেশন চিকিৎসাজনিত ‘ত্রুটি’ শোধরানোর নামে নারীদের শারীরিক নজরদারির ফাঁদে ফেলে দেয়।
এখানেই মূল সমস্যা—নারীর শরীরকে চিকিৎসা-নির্ভর একটি ‘প্রকল্প’ বানিয়ে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলোকে রোগ বানিয়ে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার চিকিৎসকের হাতে চলে যাচ্ছে। এতে শুধু অর্থনৈতিক লাভ হয় হাসপাতাল ও ঔষধ কোম্পানির, বরং নারীর ওপর সামাজিক লিঙ্গভিত্তিক আধিপত্যও জোরদার হয়।
নারীরা কেন এত সহজেই মেডিক্যালাইজেশনের শিকার হয়? কারণটি জৈবিকতা, মাতৃত্বের সামাজিক চাপ, সৌন্দর্য ও যৌবনের আদর্শ, শরীর থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং পুরুষতান্ত্রিক স্বাস্থ্যনীতি। বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীর স্বাস্থ্যের দৃষ্টিভঙ্গি প্রজনন স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো সামাজিক চাপ ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
গ্রামীণ ও দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও দুর্বল; স্বাস্থ্যসেবার অভাব, পুষ্টিহীনতা ও সঠিক চিকিৎসার অভাব তাদেরকে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার ফাঁদে ফেলে।
সুতরাং, নারীর শরীরের ‘মেডিক্যালাইজেশন’ শুধুমাত্র চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি একটি লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম। নারীরা যেন নিজের শরীর সম্পর্কে জানার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ফিরে পায়—এটাই একমাত্র সমাধান।
চিকিৎসা ব্যবস্থা যখন নারীর স্বাভাবিকতাকে রোগ বানিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন আমাদের সমাজ ও স্বাস্থ্যনীতিকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে নারীর জীবন ও অধিকার রক্ষার জন্য।

Responses