বাংলাদেশে ডিভোর্সের সংখ্যা বৃদ্ধি: অতিরিক্ত কাবিন ও নারী কর্মসংস্থান

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ডিভোর্সের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান দুটি কারণ হলো অতিরিক্ত কাবিনের প্রথা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি। এই প্রবন্ধে আমরা এই দুটি কারণ বিশ্লেষণ করে দেখবো কিভাবে তারা ডিভোর্সের প্রবণতায় ভূমিকা রাখছে।

অতিরিক্ত কাবিনের প্রভাব
কাবিন বা দেনমোহর হলো একটি অর্থের পরিমাণ যা বিয়ের সময় স্বামী স্ত্রীর প্রতি প্রতিশ্রুতি দেয়। বাংলাদেশে কাবিনের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত হয়ে থাকে, যা বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

1. অর্থনৈতিক চাপ:
– অতিরিক্ত কাবিনের পরিমাণ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে যা স্বামীর পক্ষে পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি পারিবারিক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হতে পারে।

2. বিয়ের স্থায়িত্বে প্রভাব:
– কাবিনের পরিমাণ বেশি হলে অনেক সময় পুরুষরা বিয়ে বিচ্ছেদে ভয় পান এবং সম্পর্কের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা না করে পরিস্থিতিকে সহ্য করেন। কিন্তু নারীরা এই পরিস্থিতিতে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য ডিভোর্সের পথ বেছে নেন।

নারী কর্মসংস্থানের প্রভাব
নারীদের কর্মসংস্থানের হার বৃদ্ধি পাওয়া ডিভোর্সের অন্যতম একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা তাঁদের বিয়ের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে।

1. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা:
– নারীরা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা তাঁদের নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতা দিচ্ছে। তাঁরা আর্থিক নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হয়ে সম্পর্কের অবনতি হলে সহজে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।

2. নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা:
– কর্মজীবী নারীরা তাঁদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হচ্ছেন। তাঁরা বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার হলে তা মেনে নিতে নারাজ এবং ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

পরিসংখ্যান ও ডাটা বিশ্লেষণ
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিভোর্সের সংখ্যা গত দশকে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০০০ জনের মধ্যে ডিভোর্সের হার ৫-৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী ডিভোর্সের সংখ্যাও গত কয়েক বছরে বেড়েছে, যা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

কেস স্টাডি
ঢাকা শহরের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীদের ৬৫% ডিভোর্সের কারণ হিসেবে পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনকে দায়ী করেছেন। ৫০% নারী তাঁদের কর্মসংস্থানকে ডিভোর্সের সিদ্ধান্তে সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ৪০% নারী অতিরিক্ত কাবিনের পরিমাণকে সম্পর্কের অবনতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা
এই সমস্যার সমাধানে কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে:

1. কাবিনের নিয়মিত পর্যালোচনা
– কাবিনের পরিমাণ যৌক্তিক রাখা এবং এটি নিয়মিত পর্যালোচনা করা উচিত যাতে এটি অর্থনৈতিক চাপ না সৃষ্টি করে।

2. পারিবারিক পরামর্শ ও কাউন্সেলিং:
– বিয়ের পূর্বে এবং বিয়ের পর পারিবারিক পরামর্শ ও কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করা উচিত। এতে সম্পর্কের মান উন্নত হবে এবং ডিভোর্সের হার কমবে।

3. নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সমর্থন:
– কর্মজীবী নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সমর্থন প্রদান নিশ্চিত করা উচিত, যাতে তাঁরা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করতে পারেন এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশে ডিভোর্সের সংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে অতিরিক্ত কাবিন এবং নারী কর্মসংস্থানের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সমস্যার সমাধানে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং সামাজিক ও আইনি সহায়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সম্পর্কের মান উন্নতিতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবেই ডিভোর্সের হার কমিয়ে একটি স্থিতিশীল সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।

Related Articles

আপনার ব্যবসার মার্কেটিং সোশ্যাল মিডিয়াতেই কেন করবেন?

আপনার ব্যবসার মার্কেটিং সোশ্যাল মিডিয়া তেই কেন করবেন? আপনি কি জানেন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি? আমরা যে ব্যবসায় করি না কেন, সেটা কোথায় করি? যেখানে…

 রাসেল ভাইপার বা (চন্দ্রবোড়া) সাপ সর্ম্পকে জেনে নিন

লিটন হোসাইন জিহাদ:  রাসেল ভাইপার সাপ (Daboia russelii), যা চন্দ্রবোড়া নামে পরিচিত, একটি অত্যন্ত বিষাক্ত সাপ এবং এটি বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া…

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নেটওয়ার্ক: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও উন্নয়নের এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জেলা। এই জেলার মানুষ তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য এবং বিশ্বের দরবারে নিজেদের পরিচিতি…

ব্যবসার ব্যান্ডিং করার জন্য কেন ডোমেইন ও হোস্টিং প্রয়োজন?

ডোমেইন হোস্টিং কিভাবে ব্যবসা বৃদ্ধি করতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া কেন প্রচার দরকার সার্বিকভাবে, ডোমেইন ও হোস্টিং একটি ব্যবসাকে অনলাইনে উপস্থিত ও সক্রিয় হতে সহায়তা করে,…

বর্তমান সময়ে নিজেকে সময় উপযোগি হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল

বর্তমান সময়ে নিজেকে সময় উপযোগি হিসেবে গড়ে তোলা এবং সফল হওয়ার জন্য বিভিন্ন দিক থেকে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ প্রযুক্তির যুগে কর্ম  না জানলে…

Responses

Your email address will not be published. Required fields are marked *