বিলুপ্তির পথে আলিয়াজুরি নদী: খনন ও অবৈধ বাঁধ অপসারণে দ্রুত উদ্যোগের দাবি

1 min read 4 words 111 views

এটি কোনো বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ নয়—এটি এক সময়ের প্রবাহমান, প্রাণবন্ত একটি নদী। নাম তার আলিয়াজুরি নদী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তিতাস নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে সীমনা সড়কের সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়ে বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর হয়ে কালাছড়া এলাকায় গিয়ে মধ্যগঙ্গা ও বালিয়াজুরি নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে এই নদী। এক সময় এই নদী ছিল জনপদের প্রাণ, আর এখন তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে অস্তিত্বের লড়াইয়ে।স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক বছর আগেও আলিয়াজুরি নদী ছিল নৌ-যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বর্ষা মৌসুম এলেই নদীটি প্রাণ ফিরে পেত। বিজয়নগরের মনিপুর, পত্তন, চম্পকনগরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ এই নদীপথেই সহজে যাতায়াত করতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সঙ্গে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে নদীটির ছিল ব্যাপক ব্যবহার।শুধু যোগাযোগই নয়, কৃষি অর্থনীতিতেও এই নদীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আশপাশের বিস্তীর্ণ ফসলি জমির সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হতো এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করে। এমনকি শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে থাকা অল্প পানি ব্যবহার করে কৃষকরা কোনো না কোনোভাবে সেচ দিয়ে জমিতে ফসল ফলাতে সক্ষম হতেন। ফলে এলাকার মাঠগুলো থাকত সবুজে ঘেরা, শস্যে ভরা।কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অবহেলা, পরিকল্পনার অভাব এবং নাব্যতা সংকটের কারণে নদীটি আজ মৃতপ্রায়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো খনন কার্যক্রম না হওয়ায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। অনেক স্থানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চরের মতো অবস্থা। কোথাও কোথাও নদীটি এতটাই ভরাট হয়েছে যে তা আর নদী বলে মনে হয় না—দেখলে মনে হয় যেন বিস্তীর্ণ শুকনো মাঠ।স্থানীয়দের অভিযোগ, আলিয়াজুরি নদীর এই করুণ অবস্থার পেছনে প্রধান কারণগুলোর একটি হলো তিতাস নদীর নাব্যতা হ্রাস ও খননের অভাব। যেহেতু এই নদী তিতাস থেকে উৎপন্ন, তাই তিতাসে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় আলিয়াজুরিতেও তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে।এর পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বিশেষ করে দত্তখলা বিল এলাকা থেকে সীমনা সড়ক সংলগ্ন চর ইসলামপুর এলাকায় নদীর মাঝখানে মাটি ফেলে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধ ব্যবহার করে ট্রাক্টরের মাধ্যমে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মতে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।এলাকাবাসী জানান, এ ধরনের বাঁধ নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে এবং নদীর দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে বর্ষা মৌসুমেও আগের মতো পানি জমে না, আর শুকনো মৌসুমে নদী প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়।

এ বিষয়ে সামাজিক সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “আলিয়াজুরি নদী এক সময় এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু অবহেলা, দখল এবং অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে আজ নদীটি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই নদীর নামই শুধু শুনবে, বাস্তবে আর দেখতে পাবে না।”তিনি আরও বলেন, “নদী রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে খনন কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং নদীর ওপর নির্মিত সব অবৈধ বাঁধ অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে নদী দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।”এদিকে সচেতন মহল মনে করছেন, এখনই যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তবে অচিরেই আলিয়াজুরি নদী পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। তাই তারা দ্রুত নদীটি পুনরুদ্ধারে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Related Articles

অবৈধ দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত তিতাস নদী, পুনরুদ্ধারে জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ

1 min read 4 words 124 views অবৈধ দখল, ভরাট ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়া তিতাস নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন।…

বোয়ালিয়া খাল পুনঃখনন কার্যক্রমে গতি, সরেজমিন পরিদর্শনে ‘তরী বাংলাদেশ’, টেকসই বাস্তবায়নের প্রত্যাশা

1 min read 3 words 52 views দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের বোয়ালিয়া খাল পুনঃখনন কার্যক্রম জোরদারভাবে এগিয়ে…

তিতাস নদীর কচুরিপানা অপসারণে ভাদুঘর বাজারে জনসভা অনুষ্ঠিত

1 min read 2 words 23 views ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর তীরবর্তী জনপদে কচুরিপানার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসনে স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত…

Responses