ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাবার মরদেহ গ্রহণে অনিচ্ছা ছেলের — সমাজের বিবেক নাড়া দেয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা

বাবার মরদেহ গ্রহণ করেননি ছেলে
1 min read 17 words 20 views

লিটন হোসাইন জিহাদ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর হাসপাতালের নিঃসঙ্গ এক করিডোরে নিথর পড়ে ছিল এক পিতার মরদেহ। ৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইব্রাহিম—একজন মানুষ, যিনি জীবনভর চড়াই-উতরাই পার করে হয়তো একটু ভালোবাসা, একটু স্বীকৃতির আশায় বেঁচে ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তার প্রাপ্তি শুধু নিঃসঙ্গতা আর প্রত্যাখ্যান। সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণে প্রকাশ করলেন অনিচ্ছা। এক পিতার জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে?

মৃত ইব্রাহিমের জীবনের গল্পটি যেন একটি চলমান ট্র্যাজেডির রূপরেখা। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের হালিশহরের ফইল্লাতলি বাজারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটি হিন্দু পরিবারে। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তার নাম রাখেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়তো ছিল আত্মিক উপলব্ধি থেকে, কিন্তু এই পরিবর্তন তাকে সমাজে করে তোলে আরো একা।

বাবার মরদেহ গ্রহণ করেননি ছেলে
বাবার মরদেহ গ্রহণ করেননি ছেলে

যুবক বয়সে চট্টগ্রাম ছেড়ে দেন ইব্রাহিম। ঘুরেছেন নানা এলাকা, খুঁজেছেন জীবিকার পথ। এক সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার কাদেরপুল, মহিষকার এলাকায় গড়ে তোলেন সংসার। জন্ম হয় এক পুত্র সন্তানের। কিন্তু সেই সংসারও ছিল স্বস্তির নয়। স্ত্রী তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে, সন্তানও হয় দূরবর্তী, শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় এমন নির্মম পরিণতিতে—যেখানে পিতা মারা যাওয়ার পরেও সন্তান বলছে, “আমি মরদেহ গ্রহণ করবো না।”

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার শেষ পরিণতি ছিল আরেক মানবিক উদাহরণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর  প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আজহার উদ্দিন এগিয়ে আসেন। মঙ্গলবার (১ জুলাই) বিকেলে তার দাফন সম্পন্ন করেন তারা। এক নিঃস্ব পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দায়িত্ব পালন করেন সম্পূর্ণ অচেনা কিছু মানুষ — সমাজের সেই বাতিঘরেরা, যাদের উপস্থিতি আজও প্রমাণ করে, মানবতা মরে যায়নি সম্পূর্ণ।

এই ঘটনা কেবল ইব্রাহিমের একক জীবনের গল্প নয়, এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম আয়না। যেখানে ধর্মান্তরিত হওয়া, ভিন্নপথে হাঁটা কিংবা সামাজিক নিঃসঙ্গতা একটি মানুষকে জীবদ্দশায় শুধু নয়, মৃত্যুর পরেও একাকী করে তোলে। সন্তান যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন প্রশ্ন জাগে — রক্তের সম্পর্ক কি এতটাই ঠুনকো?

বাবার মরদেহ গ্রহণ করেননি ছেলে
বাবার মরদেহ গ্রহণ করেননি ছেলে

একজন মানুষের জীবনের শেষ সময়ে এমন পরিত্যাগ, এমন অবহেলা শুধু একটি পরিবার নয়, সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। মৃত্যুর পর সম্মান পাওয়ার অধিকার কি তারও থাকে না, যিনি জীবনে সব হারিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন একটু ভালোবাসার আশায়?

আজ ইব্রাহিম আমাদের সামনে রেখে গেলেন এক প্রশ্নচিহ্ন — আমরা কী সত্যিই এতটাই ব্যস্ত, এতটাই আত্মকেন্দ্রিক, যে নিজের পিতা-মাতার মরদেহকেও অস্বীকার করতে পারি?

‘বাতিঘর’ নামক সংগঠনের নীরব এই কর্মযজ্ঞ আমাদের চোখে জল এনে দেয়, আবার অন্তরে আশা জাগায় — এখনো কিছু মানুষ আছেন, যারা পরের শবযাত্রাতেও শামিল হন নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।

Related Articles

পুর্নজন্ম কি বৈজ্ঞানিক ভাবে সম্ভব? — একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ

1 min read 153 words 4.9K views মানব ইতিহাস জুড়ে মানুষের মৃত্যু ও মৃত্যুর পর কী হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বহু ধর্ম, দর্শন ও…

হাইনান এক্সপো ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের প্রবেশদ্বার

1 min read 34 words 864 views ষষ্ঠ চীন আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্য মেলা (হাইনান এক্সপো ২০২৬) আমি মোঃ জাহিদ হাসান নিরব চীন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সানিয়া ইনস্টিটিউটের)…

জুলাই বিপ্লবের সাদিম কায়েম এর যে কাহিনী সবার জানা প্রয়োজন

1 min read 5 words 3.5K views জুলাই বিপ্লব নিয়ে ইয়েনি সাফাককে (তুরস্কের গণমাধ্যম) একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জুলাই বিপ্লবের নেতা সাদিক কায়েম। তিনি ব্যাখ্যা করছেন,…

Responses