রিমান্ড শুনানিতে ফাঁস ভয়াবহ লোমহর্ষক নির্যাতনের কাহিনি, কাঁপল আদালত
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানসহ চার আসামির রিমান্ড শুনানিতে শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে নির্যাতনের ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালতে শুনানির এক পর্যায়ে বিচারক নিজেই ভুক্তভোগী শিশুটির জবানবন্দির কিছু অংশ পড়ে শোনান। সেই বর্ণনা শুনে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং এক সময় জবানবন্দি আর না পড়ার অনুরোধ জানান।
আদালতে জানানো হয়, মাত্র ১১ বছরের শিশু মোহনাকে নিয়মিত খুন্তি দিয়ে মারধর করা হতো এবং তার চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হতো।
দীর্ঘ সময় তাকে বাথরুমে পানির মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল, যার ফলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পায়ে পচন ধরে যায়। শীতকালেও তাকে কোনো শীতের পোশাক দেওয়া হয়নি। ভালো খাবার তো দূরের কথা, বেঁচে থাকার জন্য তাকে বাথরুমের পেস্ট খেতে হয়েছে এবং টয়লেটের পানি পান করতে হয়েছে বলেও জবানবন্দিতে উঠে আসে।
বিচারক বলেন, শিশুটির শরীরে মুখ থেকে গলা পর্যন্ত লম্বা পোড়া দাগ রয়েছে, যা এখন সাদা হয়ে আসছে। কপালে লাঠির আঘাতের চিহ্ন, হাতে বাঁশের লাঠির ও পোড়া দাগ এখনো দগদগে অবস্থায় আছে। পায়ের উরুতে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকার দাগ, পিঠে বাঁশের লাঠির অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন এবং চোখের চারপাশে কালো দাগের কথাও উল্লেখ করা হয়। মাথার চুল ধরে টানার কারণে তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং শরীরে জ্বর থাকার কথাও জানিয়েছে শিশুটি।
এই বর্ণনা শোনার পর আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা আর সহ্য করতে না পেরে জবানবন্দি পাঠ বন্ধ করার অনুরোধ জানান। এক পর্যায়ে বিচারক সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বিথীকে প্রশ্ন করলে তিনি শিশুটিকে নির্যাতনের কথা আংশিক স্বীকার করেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক রুবেল মিয়া সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বিথী এবং দুই গৃহকর্মীর সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানির দিন বিকেলে চার আসামিকে মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার রিংকিসহ একাধিক আইনজীবী শুনানি করেন এবং শতাধিক আইনজীবী আসামিদের রিমান্ডে পাঠানোর পক্ষে সমর্থন জানান।
শুনানিতে ফাহমিদা আক্তার বলেন, ভুক্তভোগীর ওপর চার আসামিই পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছেন। ১২ বছরের নিচে একটি শিশুকে এভাবে নির্যাতন করা গুরুতর অপরাধ। তিনি জানান, শুরুতে শিশুটিকে খাটে রাখা হলেও পরে তাকে মেঝেতে, বারান্দায় এবং শেষ পর্যন্ত টয়লেটে থাকতে বাধ্য করা হয়।
শীতের মধ্যেও তাকে শীতের পোশাক দেওয়া হয়নি এবং টয়লেটের পেস্ট ও টিস্যু খেয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। সরকারি উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের নির্যাতন দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি এবং সর্বোচ্চ রিমান্ডের আবেদন জানান।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে আইনজীবী এ কে আজাদ রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, সাফিকুর রহমান অফিস করতেন এবং সপ্তাহে মাত্র এক দিন বাসায় থাকতেন, তাই তিনি এ ঘটনার বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তবে আদালত শুনানি শেষে সাফিকুর রহমান ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুনকে পাঁচ দিন, তার স্ত্রী বিথীকে সাত দিন এবং অপর গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমকে ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসায় শিশু দেখাশোনার জন্য ছোট মেয়ে খোঁজার কথা জানানো হলে গত বছরের জুন মাসে মোহনাকে সেখানে কাজে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর তার বাবা গোলাম মোস্তফা মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন। এরপর আর তাকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বিথী ফোন করে জানালে মোহনাকে নিতে গিয়ে বাবা দেখতে পান, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম রয়েছে এবং সে ঠিকভাবে কথাও বলতে পারছে না। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই নির্যাতনের ভয়াবহ কাহিনি প্রকাশ্যে আসে।
এই ঘটনায় মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি এখন তদন্তাধীন এবং আদালতের রিমান্ড আদেশের পর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।
আরো সংবাদ

Responses