লিটন হোসাইন জিহাদের এক গুচ্ছ কবিতা যেন আগুন

ফ্রিজে আটকে যাওয়া মা
রাত আড়াইটায় ফ্রিজ খুললে
মা বসে থাকে তাতে,
চোখে টিফিন বক্সের মতো শীতল সংযম,
হাত দিয়ে পাঁউরুটির পাশে ঠেলে দেয় বাবার ডায়াবেটিসের ওষুধ।
“মা, তুমি এখানে?”
—আমি বলি।
মা উত্তর দেয় না।
তাঁর ঠোঁট বরফের মতো
জমে গেছে বহু বছর আগে—
যেদিন রান্না করতে করতে হঠাৎ বলেছিল,
“আজ আমি চুপ থাকব, একটু বেশি সময়ের জন্য।”
তারপর কেটে গেছে ঈদ, জন্মদিন,
ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ে—
সব কিছু,
আর ফ্রিজে জমেছে ব্যর্থ উৎসবের টুকরো স্মৃতি।
মায়ের শরীরটা এখন
ঘৃত কুমারীর বোতলের পাশে থাকে,
মাঝে মাঝে লাইট জ্বলে উঠলে বোঝা যায়,
সে এখনো হিমঘরে নিঃশব্দে খোঁজে—
আদর কী জিনিস ছিল!
২. নেটওয়ার্ক নেই ঈশ্বরের
আমার নাম্বার থেকে ঈশ্বরকে ডায়াল করি,
“এটি একটি ব্যস্ত সংযোগ। পরে চেষ্টা করুন।”
আমি অপেক্ষা করি।
ছাদে উঠে খোলা আকাশে ফোন ধরি,
তবু নেট নেই।
এক পাদ্রি বলেন:
—“ঈশ্বর এখন সার্ভারে নেই,
খুব সম্ভবত কোনো আপগ্রেডে আছেন,
আপনার প্রার্থনা কুইয়ুতে আটকে গেছে।”
অন্য ধর্মের এক ফকির বলে,
—“তুই ঠিক করে SIM ব্যবহার করো,
এই অপারেটরে ঈশ্বরের সাড়া নেই রে ভাই!”
তাহলে?
এই এত সিজদা, জপ, আজান, শ্লোক—
সব কি ভেসে যাচ্ছে
WiFi-এর বাইরে কোনো ব্ল্যাকহোলে?
শেষে এক শিশু বলে:
—“ঈশ্বর তো ওয়ার্ল্ড রোমিং চালু রাখেননি,
তাই আমাদের কান্না পৌঁছায় না।”
আমি ফোনটা ভেঙে ফেলি
আর এক চিলতে নীরবতায় বলি,
“হে ঈশ্বর, যদি থাকো—
তাহলে একটিবার প্লিজ, মিসড কল দাও।”
৩. আয়নায় ঝুলে থাকা আত্মহত্যা
ঘরে কেউ নেই।
তবু আয়নায় ঝুলে আছে এক দড়ি,
নিমেষেই নিজেকে চেনা যায় না।
আয়নার আমি দাঁড়িয়ে বলি:
“আর কতোদিন মুখোশ পরে বাঁচবি?”
—আরেকটা আমি উত্তর দেয়:
“আজ তো গলায় দড়ি দিচ্ছি, একটু আরাম পাবো।”
ঘরটা থেমে যায়।
ঘড়ি বন্ধ।
দেয়াল হেঁটে যায় অন্য দিকে।
চায়ের কাপে বিষ নেই,
তবু ঠোঁট ছোঁয়ালেই
জীবনের মানে উবে যায়—
আত্মহত্যা শুধু শরীরে হয় না,
তা আগে হয় চিন্তায়,
পরে ছায়ায়,
শেষে আয়নায়—
সেখানে লাশটাও বেঁচে থাকে,
নির্বাক আর অভিমানী।
৪. পৃথিবীর শেষ শিশুটি দমবন্ধ হয়ে মরে
সে ছিল পৃথিবীর শেষ শিশু,
দুধের গন্ধ মিশে ছিল তার নিঃশ্বাসে।
কিন্তু সে যখন চিপসের প্যাকেট খুলে মুখে ঢালে—
বাষ্প ওঠে!
বাষ্প নয়, বরং ছিল
মাইক্রোপ্লাস্টিক আর কর্পোরেট হিংস্রতা।
একটি শিশুর মুখ কেবল হাসির জায়গা নয়,
এখন তা বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড।
তাকে শেখানো হয়নি কবিতা,
শেখানো হয়নি রোদে খেলতে যাওয়া,
শুধু শেখানো হয়েছিল—
কোড, রিচার্জ, সাবস্ক্রিপশন, আর বিল।
যখন তার নিঃশ্বাস আটকে আসে,
তখনো মা ভাবেন—
এটা হয়তো গেমের অংশ,
একটা “ডেথ রাউন্ড”।
কিন্তু শিশুটি সত্যিই মরে যায়।
পরে রিপোর্টে লেখা হয়—
“কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও চিনির অতিমাত্রায়
শিশুটি নিজেই মৃত্যুকে ইনহেল করেছে।”
৫. মেঘ গর্ভবতী হয় প্রতিদিন
এই মেঘরা আর বৃষ্টি আনে না,
তারা গর্ভবতী হয়—
আর প্রসব করে বজ্র, আগুন, বিষাক্ত বারুদ।
আকাশের জরায়ু এখন যুদ্ধক্ষেত্র,
সেখানে বুলেট ভাসে বৃষ্টির মতো।
এক গর্ভবতী মেঘ কাঁদে—
সে বলে, “আমি ছেলেকে বৃষ্টি বানাতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু সে হয়ে গেল টিয়ারগ্যাস।”
পাখিরা এখন ডিম পাড়ে না,
তারা জন্ম দেয় ড্রোন।
ফুলগুলো সৌরপ্যানেলে রূপ নেয়,
আর শিশুরা গান শেখে না—
শিখে বেঁচে থাকার কোড।
এই বিশ্ব এখন এক মায়ের গর্ভ—
যেখানে সন্তানেরা জন্ম নেয়
মৃত্যুকে উপহার দিতে।
৬. শবদেহের কাছে আত্মজীবনী পড়ে শোনায় এক কবি
ঘরে রাখা লাশটা আমারই,
তবু আমি বেঁচে আছি।
অথচ আমার হাত কাঁপে না
যখন কবিতার লাইনে লিখি:
“আমি ভালো আছি, বেঁচে আছি, মুক্ত।”
কিন্তু প্রতিটি শব্দ পড়ে গিয়ে সে লাশ—
চোখের কোণে জল রাখে।
আমি ভয় পাই,
কারণ মৃতরা যদি কাঁদতে শেখে,
তাহলে জীবিতরা আর কী নিয়ে গর্ব করবে?
একজন কবি তখন একা বসে
তার আত্মজীবনী পড়ে—
এক শবদেহের সামনে,
যার বুক চিরে এখনো বেরোয়
এক অসমাপ্ত পঙ্ক্তির গন্ধ।

Responses