POTHIKTV

শতবর্ষে লন্ডনের প্রথম মসজিদ ‘ফজল মসজিদ’: শান্তির বার্তা ও ঐতিহ্যের ১০০ বছর

লন্ডনের ওয়ান্ডসওয়ার্থে অবস্থিত ঐতিহাসিক ফজল মসজিদ প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ করেছে। শতবর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে ১০ হাজার গৃহহীন মানুষকে বিনামূল্যে খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শতবর্ষে লন্ডনের প্রথম মসজিদ ‘ফজল মসজিদ’: শান্তির বার্তা ও ঐতিহ্যের ১০০ বছর

Uncategorized ডেস্ক: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের প্রথম ও প্রাচীনতম ফজল মসজিদ প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। দক্ষিণ লন্ডনের ওয়ান্ডসওয়ার্থের সাউথফিল্ডস এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি স্থানীয়ভাবে ‘লন্ডন মসজিদ’ নামেও পরিচিত। ১৯২৬ সালে খোলার পর থেকে ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই সাদা রঙের স্থাপত্যটি এক শতাব্দী ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সেবার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।

মসজিদটির শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এই বিশেষ বর্ষপূর্তি উদযাপনে ‘এক শতাব্দীর সংযোগ’ বার্তা নিয়ে ১০ হাজার গৃহহীন মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এছাড়া স্থানীয় কমিউনিটির সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

একশ বছর আগে মসজিদটি উদ্বোধনের সময় যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এটিকে একটি সুন্দর স্থাপত্য শিল্প হিসেবে বর্ণনা করেছিল। উদ্বোধনী দিনে প্রায় ৬০০ জন বিশিষ্ট অতিথি উপস্থিত ছিলেন এবং একটি রুপার চাবি দিয়ে মসজিদের বিশাল কালো দরজা খোলা হয়েছিল।

মসজিদটি নির্মাণে অর্থায়নের পেছনে এক ঐতিহাসিক গল্প রয়েছে। ভারতের কাদিয়ানের একদল আহমাদিয়া মুসলিম এই জমি ক্রয়ের অর্থ জোগাড় করেছিলেন। তাদের মধ্যে বহু নারী ছিলেন যারা লন্ডনে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের গহনা বিক্রি করে দিয়েছিলেন, যদিও তারা জানতেন যে কখনোই এই মসজিদটি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ তাদের নাও হতে পারে।

ওয়ান্ডসওয়ার্থের পুটনি এলাকার লেবার পার্টির এমপি ফ্লিউর অ্যান্ডারসন এই মসজিদের প্রশংসা করে জানান যে, স্থানীয় এলাকায় মসজিদটি সবার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি বলেন, এই মসজিদের চমৎকার খাবার ছাড়া তাদের এলাকার কোনো স্ট্রিট পার্টিই সম্পূর্ণ হয় না।

ইউকে আহমাদিয়া মুসলিম কমিউনিটির প্রতিনিধি মাহমুদ রফিক বলেন, তাদের মূল মন্ত্র হলো ‘সবার জন্য ভালোবাসা, কারও জন্য ঘৃণা নয়’। ঈদ উপলক্ষে স্থানীয় শিশুদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ, প্রতিবেশীদের বড়দিনের শুভেচ্ছা জানানো, আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।

ঐতিহাসিক এই ভবনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের জন্য এয়ার রেড শেল্টার বা বিমান হামলা থেকে বাঁচার আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে সাম্প্রতিক সময়ে এটি রক্তদান কেন্দ্র এবং কোভিড-১৯ টিকাদান কেন্দ্র হিসেবেও সেবা প্রদান করেছে। ২০১৮ সালে ‘ঐতিহাসিক ইংল্যান্ড’ বা হিস্টোরিক ইংল্যান্ড কর্তৃক ভবনটিকে তালিকাভুক্ত বা হেরিটেজ স্ট্যাটাস দেওয়া হয়।

মসজিদটির সাথে পাকিস্তান সৃষ্টির এক বিশেষ ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। ১৯৩০-এর দশকে এই মসজিদের ইমাম আব্দুর রহিম দার্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেসময় বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লন্ডনে বসবাস করছিলেন এবং আইন পেশায় নিয়োজিত থাকার পরিকল্পনা করছিলেন। ফজল মসজিদের ইমাম জিন্নাহকে ভারতে ফিরে গিয়ে মুসলিমদের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে উৎসাহিত করেন। পরবর্তীতে জিন্নাহ মসজিদের বাগানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন যা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

আহমাদিয়া মুসলিম কমিউনিটির বর্তমান ও পঞ্চম প্রধান মির্জা মাসরুর আহমদ এই শতবর্ষ উপলক্ষে বলেন যে, মসজিদের ইতিহাস প্রতিবেশী সেবা, দেশের প্রতি আনুগত্য এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের সাথে শান্তির নীতি তুলে ধরে। তিনি প্রার্থনা করেন যেন এই মসজিদ আগামী প্রজন্মগুলোর জন্যও শান্তির আলোকবর্তিকা হয়ে থাকে।

অথেন্টিক সোর্স: The Guardian – Islam
1
0 comments·1 share