সুজন বহিষ্কার হল কিন্তু তার সাথে নাটের গুরু কারা ছিল?
নিজস্ব সংবাদদাতা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লুৎফা মাহবুবা রুবি (৫৫) নামক এক নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও তার অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলা বিএনপির নেতা সুজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু উক্ত নারীর আত্মহত্যা ও তার অর্থ আত্মসাতের সাথে কয়েকজন রাঘববোয়াল জড়িত আছে বলে জানা যাচ্ছে। মামলার এজহার অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় প্রতারণায় সাজেদুল কিবরিয়া সুজনকে সহযোগিতা করেছেন প্রভাবশালী আরও তিন ব্যক্তি।
এলাকাবাসীরা জানান, প্রতারক সুজনের সাথে উক্ত সম্পত্তির তিনজন ক্রেতা এই প্রতারণার সাথে সরাসরি যুক্ত আছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পুরো প্রতারণার বিষয়টি সামনে এসে যাবে।
এদিকে সুজনের বহিস্কারাদেশটি জেলা কমিটি থেকে সাময়িক করা হয়েছে। কিন্তু বিএনপি’র গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্র ছাড়া কেউ জেলা কমিটির কাউকে বহিষ্কার করতে পারে না। গণমাধ্যমে এসব প্রতারণার খবর চলে আসায় বিষয়টি দ্রুত হালকা তরে ধামাচাপা দেয়ার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সভাপতি ও সেক্রেটারির স্বাক্ষর করা এই বহিষ্কারাদেশটি দ্রুত অনুমোদন করা হয়। যার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল রাঘববোয়ালদের আড়াল করে শুধুমাত্র সুজনের বহিষ্কারাদেশ প্রদান করা। সেই সাথে সুজন কান্ডের বিষয়টি কেন্দ্র বিমুখ করাও এই বহিষ্কারাদেশের উদ্দেশ্য ছিল।
ঘটনার বিস্তারিত:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের পূর্ব মেড্ডা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মেডিনোভা ভবনটি তৎসংলগ্ন জমিসহ বিক্রির টাকা আত্মসাতের ঘটনার প্রতারণার শিকার হয়ে লুৎফা মাহবুবা রুবি (৫৫) নামক এক নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
উক্ত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ও আত্মহত্যার প্ররোচনার ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির নেতা সাজেদুল কিবরিয়া সুজনকে অভিযুক্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন নিহত লুৎফা মাহবুবা রুবির মা মোমেনা শরিফা বেগম (৭৮) নামের বয়োবৃদ্ধা এক নারী।
নিহতের মা মোমেনা বেগম এজাহারে অভিযোগ করেন, সুজন ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে জমির প্রকৃত মূল্য গোপন করে এবং নানা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের থেকে চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেন। যখন তারা সুজনের কাছে বাকী টাকা দাবি করেন, তখন তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা পরিচয় দিয়ে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন।
নিহত লুৎফা মাহবুবা রুবি (৫৫)
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনাটি জানতে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মেড্ডা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মেডিনোভা হাসপাতালটি ৯.৩৭ শতাংশ জমির উপর অবস্থিত। জমির মালিক ছিলেন রুবির বাবা ডা. এ রসূল। তার নেতৃত্বে ভবনটিতে মেডিনোভা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। তার মৃত্যুর পর স্থাবর সম্পদটি দেখাশুনা করতেন তার স্ত্রী মোমেনা শরিফা বেগম ও মেয়ে লুৎফা মাহবুবা রুবি। পরে তারা স্থাবর সম্পত্তিটি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন বহুদিন ধরে।
মেডিনোভা ভবনটির সামনে কিছু দোকান আছে। যা পূর্বে মোমেনা বেগম কতিপয় ব্যক্তির নিকট বিক্রি করেন। মূলত এই দোকানগুলোর ক্রেতারাই তাদেরকে এই জমি ও ভবনটি বিক্রির ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে বাধা দিয়ে আসছিলেন। এইজন্য আওয়ামী লীগের সময় কয়েক দফা বিক্রির প্রচেষ্টা চালিয়ে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
৫ ই আগস্টের পর মা-মেয়ে আবারো সম্পত্তিটি বিক্রির জন্য নতুন উদ্দ্যোম শুরু করেন। তখন তারা সাজেদুল কিবরিয়া সুজন নামক প্রতারকের খপ্পরে পড়েন। স্থাবর সম্পত্তিটির সহজাত বাজার মূল্য ৯ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার উপরে হলেও সুজনের সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মাত্র ৩ কোটি ২০ লক্ষ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। পরে সেখানে তাদের সাথে আরও প্রতারণা করা হয়। বয়োবৃদ্ধ মা ও তার মেয়েকে ব্ল্যাকমেইল করে সুজন গংরা। বিভিন্ন কারসাজিতে মাত্র ১ কোটি ১৭ লক্ষ টাকায় রেজিস্ট্রি করে নেয় সুজন ও তার অজ্ঞাত সহযোগীরা। বাকী ২ কোটি টাকা মৌখিক বাকি রেখে পরে দেয়া হবে বলে তাদের জানানো হয়। সরল বিশ্বাসে স্থাপর সম্পত্তি মালিক মা ও মেয়ে সুজনের কথা বিশ্বাস করে নেয়। এ ছাড়া পরিশোধকৃত সেই টাকা থেকে আবার ২০ লক্ষ টাকা সুজন ধার হিসাবে জোরপূর্বক রেখে দেয়। যা পরবর্তীতে আর ফেরত দেয়নি সুজন। ধার হিসেবে রেখে দেওয়া ২০ লক্ষ টাকা ও বাকী দুই কোটি টাকা আদায়ে নিহত লুৎফা মাহবুবা রুবি প্রতারক সাজেদুল কিবরিয়া সুজনকে বারবার তাগাদা দিচ্ছিল।
টাকা আদায়ে কোনরূপ সাড়া না পেয়ে রুবি ৭ জুলাই সন্ধ্যায় সুজনের বাড়ীতে যান। এ সময় সুজন পাওনা টাকা পরিশোধ না করে উল্টো রুবির সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে, তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে বের করে দেয়। উক্ত স্পটেই রুবি অসুস্থ হয়ে যান এবং সুজন কর্তৃক অর্থ আত্মসাৎ ও উদ্ভূত অপমান সইতে না পেরে নিজকে বিষপানে আত্মহত্যার কথা প্রকাশ্যে জানান। এ সময় সুজন তাকে আরও গালিগালাজ করে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করেন ও নিজের বিএনপি দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার করেন।
পরদিন ৮ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে নিজের কক্ষে অপমান সইতে না পেরে বিষপান করেন রুবি। পরে তার পরিবার দ্রুত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসায় তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সন্ধ্যায় হঠাৎ করে অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জানা গেছে এই সাজেদুল কিবরিয়া সুজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটির ১৫০ নং সদস্য।

Responses