বিএনপির বিজয়ে বদলে যেতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিশাল জয় শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই পরিবর্তনের বার্তা দেয়নি, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার গতিশীলতা পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নানা চ্যালেঞ্জ সামনে থাকলেও তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে নতুন সরকার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা অভিনন্দন জানান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে পরে টেলিফোনে কথা বলেন তারেক রহমানের সঙ্গে। তিনি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন এবং এই বিজয়কে জনগণের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা–র সরকারের পতনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে তলানিতে পৌঁছায়। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে জটিল কিছু ইস্যু—তিস্তার অমীমাংসিত জলবণ্টন, বড় বাণিজ্য ঘাটতি এবং প্রত্যর্পণ প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, পারস্পরিক সংযম ও বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন সম্ভব হলেও দেশীয় জনমতের চাপ নতুন সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

এদিকে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু, উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময় এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি আনে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি সরকারের অধীনে এই সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্কগুলোর একটি হবে চীন–এর সঙ্গে। চীনা দূতাবাস বিএনপির বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতায় চীন দীর্ঘদিনের অংশীদার। ফলে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ঢাকাকে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

বিএনপির ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির ওপর জোর দিয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ভারত, চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ সব দেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই বিজয় কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। দক্ষ কূটনীতি, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ সাফল্য ও আন্তর্জাতিক অবস্থান।

Related Articles

দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: শপথ অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের…

হাইনান এক্সপো ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের প্রবেশদ্বার

ষষ্ঠ চীন আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্য মেলা (হাইনান এক্সপো ২০২৬) আমি মোঃ জাহিদ হাসান নিরব চীন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সানিয়া ইনস্টিটিউটের) এমবিএ  ছাত্র হওয়ার সুবাদে সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ…

ক্ষমতার পালাবদলে নতুন অধ্যায়: তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনীতি, সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

মাত্র দুই বছর আগেও অনেকের কল্পনায় ছিল না যে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের ক্ষমতার ভিত্তি এত দ্রুত ভেঙে পড়বে, কিংবা দীর্ঘদিন কার্যত কোণঠাসা থাকা…

জুলাই বিপ্লবের সাদিম কায়েম এর যে কাহিনী সবার জানা প্রয়োজন

জুলাই বিপ্লব নিয়ে ইয়েনি সাফাককে (তুরস্কের গণমাধ্যম) একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জুলাই বিপ্লবের নেতা সাদিক কায়েম। তিনি ব্যাখ্যা করছেন, কীভাবে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে…

পুর্নজন্ম কি বৈজ্ঞানিক ভাবে সম্ভব? — একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ

মানব ইতিহাস জুড়ে মানুষের মৃত্যু ও মৃত্যুর পর কী হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বহু ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা চেষ্টা করেছে। অতীতে জীবনের পরের ধাপে…

Responses