বেদনার নীল প্রহর (পর্ব-৩)
নদীর
ধারে আজকের বিকেলটি এক অদ্ভুত নীরব
স্বপ্নের মতো লাগছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে, তার সোনালি রশ্মি নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে কোমল আলো। বাতাসে হালকা নোনা ঘ্রাণ, ঢেউ এসে আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছে বালুচর—সব মিলিয়ে প্রকৃতি
এক নিঃশব্দ সঙ্গীত হৃদয়ের কুড়িডোরে সুর তুলছে
আমি
একেই নদীর কুল ঘেষে হাঁটছি। বিকেল হলে শহরের মানুষজন
বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্যই এখানে জড়ো হয়। নদীর কাছে আসলেই আমার মনে জাগে অজানা কৌতূহল, এক ধরনের অদ্ভুত
প্রত্যাশা। জীবনের সকল উদাসিনতা উড়ে যায় ঢেউয়ের শিওরে।
জীবনের সকল কোলাহল এই
নদীতীরে এসে থমকে দাঁড়ায়। ভাবনার গভীরে যখন ভাবনার
জন্ম হচ্ছে-
ঠিক
তখনই রায়হানা এসে দাঁড়াল আমার সামনে। চোখে তার চিরচেনা খেয়ালী হাসি।
— “পথিক,
তোমাকে একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। সে রাজুতি।”
আমি
তাকালাম।নদীর কূলে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি যেন প্রকৃতিরই অংশ। লাল পাড়ের শাড়ি হাওয়ায় দুলছে, চুলের মসৃণ রেখা কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। শ্যামলা মুখে এক মৃদু হাসি,
চোখে কাজলের গভীরতা—সব মিলিয়ে সে
যেন এক জীবন্ত কবিতা।
আমি
ধীরে বললাম, — “কেমন আছেন আপনি”
সে
তাকিয়ে হালকা হাসল, — “শুভ বিকেল। সাংবাদিকতার খোঁজে এসেছেন?”
তার
কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতা, অথচ কোথাও এক অদৃশ্য টান।
রায়হানা
মুচকি হেসে বলল,
— “চল,
একটু হাঁটি। কফিও খাওয়া যাবে। আলাপটা জমে উঠুক।”
আমরা
তিনজন নদীর কূল ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর কথোপকথন আপনাতেই
গভীর হয়ে উঠল। শহর, সংবাদ, সাহিত্য—সবকিছু নিয়েই কথা হচ্ছিল, কিন্তু রাজুতির কথায় ছিল আলাদা এক সংবেদনশীলতা। সে
শুধু তথ্য বলছিল না, প্রতিটি কথার ভেতরে ছিল অনুভবের স্পর্শ।
তার
হাঁটার ছন্দ, কথা বলার ভঙ্গি, মাঝে মাঝে থেমে নদীর দিকে তাকানো—সবকিছু যেন পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছিল।
সেই
দিন থেকেই শুরু হলো আমাদের আরেক জগতের সংযোগ—ফেসবুক মেসেঞ্জারে।
ছোট ছোট বার্তা, অল্প কথার হাসি, মাঝেমধ্যে গভীর কিছু ভাবনা—অদেখা এক বন্ধন ধীরে
ধীরে তৈরি হতে লাগল।
একদিন
আমরা ঠিক করলাম—শহরের বাইরে, নদীর ধারে একটা বিকেল কাটাবো।
রিকশা
থেকে নেমে যখন আমরা হাঁটছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল সময় যেন একটু ধীরে বয়ে যাচ্ছে। নরম বালুচরে পায়ের শব্দ, দূরের পাখির ডাক, আর নদীর স্রোতের
সুর—সব মিলিয়ে এক
অদ্ভুত প্রশান্তি।
রাজুতি
সেই দিনও লাল শাড়িতে। বাতাসে তার চুল উড়ছিল, নদীর ধারে বাতাসটা তখন একটু ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। সূর্যের আলো নরম হয়ে নদীর জলে লালচে ছায়া ফেলছে। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম, কিন্তু কথার চেয়ে নীরবতাই যেন বেশি কথা বলছিল।
রাজুতি হঠাৎ থেমে নদীর দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— “পথিক, তুমি কি কখনো খেয়াল
করেছ… নদী থামে না, কিন্তু তার ভেতরে কত কিছু জমে
থাকে?”
তার কণ্ঠে এমন এক শান্ত গাম্ভীর্য
ছিল, যা আমাকে একটু
থামিয়ে দিল।
আমি হালকা হেসে বললাম,
— “মানুষও তো তাই… বাইরে
চলতে থাকে, ভেতরে অনেক কিছু জমে যায়।”
সে মাথা নাড়ল।
চোখ তখনও নদীর দিকে।
— “হ্যাঁ… কিছু কথা বললে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু না বললে থেকে
যায়… ঠিক এই স্রোতের মতো।”
আমি তার দিকে তাকালাম। মনে হলো, সে শুধু কথা
বলছে না—কিছু অনুভব
করাচ্ছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “তুমি কি এমন কিছু
জমিয়ে রেখেছ?”
সে একটু হাসল,
কিন্তু সেই হাসিতে যেন পুরো আলো ছিল না।
— “সবাই রাখে, পথিক। কেউ ভুলে যেতে চায়, কেউ মনে রাখতে বাধ্য হয়।”
বাতাসে তার চুল উড়ে এসে মুখে পড়ছিল। সে ধীরে হাত
দিয়ে সরাল।
আমি বললাম,
— “তোমার কথাগুলো শুনে মনে হয়, তুমি অনেক কিছু দেখেছ।”
সে একটু চুপ
করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
— “সবকিছু দেখা যায় না… কিছু জিনিস শুধু ভেতরে থেকে যায়। আর সেগুলো মানুষকে
বদলে দেয়।”
তার কথাগুলো সহজ, কিন্তু কোথাও যেন একটা চাপা ভার ছিল।
আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কিছু দূর গিয়ে সে হালকা গলায়
বলল,
— “তুমি জানো, মানুষ আসলে কী চায়?”
আমি তাকিয়ে বললাম,
— “কি?”
সে মৃদু হেসে
বলল,
— “একটা জায়গা… যেখানে কিছু লুকাতে হবে না।”
আমি একটু ভেবে বললাম,
— “তুমি কি এমন জায়গা
পেয়েছ?”
সে সরাসরি উত্তর
দিল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “হয়তো পেয়েছিলাম… কিন্তু সবকিছু সবসময় থাকে না।”
তার এই কথাটা খুব
সাধারণ শোনালেও, কোথাও যেন একটু থেমে গেল।
আমি বললাম,
— “তাহলে এখন?”
সে আমার দিকে
তাকিয়ে হালকা হাসল,
— “এখন শিখছি… যেখানে ভালো লাগে, সেখানেই কিছুক্ষণ থামতে।”
তার সেই হাসিটা শান্ত ছিল, কিন্তু পুরোপুরি নির্ভার না।
আমরা নদীর ধারে বাশের মাছা করে একটি ছোট টং দোকান,
বাশ কেটে সুন্দর করে বসার একটা জাযগা করা আছে আমি আর সেজুতি সেখানে বসে দুটো চার অর্ডার
করলাম। চারপাশে নরম
আলো, হালকা বাতাস। সাথে টং দোকানে বসে চার অনুভুতি
পৃথিবীর সেরা কিছু প্রাপ্তির তৃপ্তি এনে দিয়েছিল ঐদিন।
সে কাপটা হাতে নিয়ে বলল,
— “কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোকে বেশি ভাবা উচিত না… শুধু অনুভব করা উচিত।”
আমি বললাম,
— “আজকের মতো?”
সে মাথা নেড়ে
বলল,
— “হ্যাঁ… আজকের মতো।”
কিছুক্ষণ আমরা চুপ করে থাকলাম। সেই নীরবতায়ও অদ্ভুত একটা স্বস্তি ছিল।
হঠাৎ সে আবার বলল,
— “পথিক, তুমি কি বিশ্বাস করো—সব মানুষ ঠিক
সময়েই একে অপরের জীবনে আসে?”
আমি বললাম,
— “হয়তো… না হলে দেখা
হতো না।”
সে একটু ধীরে
বলল,
— “হয়তো ঠিক সময়েই আসে… কিন্তু সবাই থাকার জন্য আসে না।”
তার কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। কেন জানি না, কিন্তু কথাটা মনে রয়ে গেল।
তারপর সে হেসে বলল,
— “আমি না, একটু বেশি ভাবি।”
আমি হেসে বললাম,
— “ভালোই তো… তোমার কথা শুনলে মনে হয়, একটা গল্পের ভেতরে আছি।”
সে তাকিয়ে রইল
কিছুক্ষণ, তারপর খুব আস্তে বলল,
— “গল্পের ভেতরে থাকাই ভালো… বাস্তব কখনো কখনো কঠিন হয়ে যায়।”
সেই
বিকেলটি শেষ হয়েছিল, কিন্তু তার রেশ থেকে গিয়েছিল আমাদের ভেতরে।
নদীর ঢেউ, লাল শাড়ির দুলন, আর কিছু অব্যক্ত
অনুভূতি—সব মিলিয়ে সেটি
হয়ে উঠেছিল এক নিঃশব্দ কবিতা।
সন্ধ্যার আলো নরম হয়ে নামতে নামতে শহরটা যেন একটু থেমে যায়। নদীর ধারের বিকেলটাকে পেছনে ফেলে বাসায় ফিরলাম—চারপাশে সবই আগের মতো: দেয়াল, টেবিল, বই, আলো। তবু ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত শূন্যতা
রয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, বিকেলের কিছু কথা, কিছু নীরবতা এখনো আমার সঙ্গেই হাঁটছে।
মোবাইলটা টেবিলে পড়ে ছিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তুলে নিলাম।
ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটা নতুন নোটিফিকেশন।
রাজুতি।
ছোট্ট একটা বার্তা—
— “পৌঁছেছ, পথিক?”
আমি লিখলাম,
— “হ্যাঁ, একটু আগে। তুমি?”
— “আমিও… কিন্তু মনে হচ্ছে এখনো যেন ফিরিনি।”
তার কথাটা পড়ে থমকে গেলাম। মনে হলো, বিকেলটা শেষ হয়নি—শুধু জায়গা বদলেছে।
আমি লিখলাম,
— “কিছু কিছু বিকেল এমনই হয়… শেষ হয় না।”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
— “আজকেরটা একটু অন্যরকম ছিল।”
— “কেন?”
ওপাশে সামান্য বিরতি। তারপর—
— “কারণ আজ আমি নিজেকে
একটু কম লুকিয়েছি।”
লাইনটা পড়তে পড়তে মনে হলো, সে যেন আমার
সামনেই বসে আছে।
— “তুমি কি সবসময় নিজেকে
লুকিয়ে রাখো?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর—
— “সবাই রাখে, সখা।”
আমি থেমে গেলাম।
শব্দটা নতুন, অথচ অদ্ভুতভাবে কাছের।
— “সখা?”
— “হ্যাঁ… এমন কাউকে বলা যায়, যার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়—নিজেকে একটু
কম লুকাতে হয়।”
শব্দটার ভেতরে এক ধরনের নীরব
উষ্ণতা ছিল। বুঝতে পারলাম, আমাদের কথার ভেতর দিয়ে অচেনা কিছু ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে।
আমি লিখলাম,
— “তাহলে আমি ভাগ্যবান।”
সে সঙ্গে সঙ্গে
উত্তর দিল না। একটু পর লিখল—
— “ভাগ্য… সবসময় একরকম থাকে না, পথিক।”
এই কথার ভেতরে
হালকা একটা ভাঙন টের পেলাম।
— “কিছু হয়েছে?”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর নেই। শুধু ‘typing…’ আসে, মিলিয়ে যায়।
শেষমেশ সে লিখল—
— “তুমি কি কখনো এমন
কাউকে বিশ্বাস করেছ, যাকে মনে হয়েছিল—সে কখনো বদলাবে
না?”
আমি থেমে লিখলাম,
— “হয়তো… কেন বলছ?”
তার উত্তর এল ধীরে, ভাঙা
লাইনে—
— “কারণ আমি করেছিলাম।”
— “অনেকটা সময়… অনেকটা বিশ্বাস…”
— “তারপর একদিন বুঝলাম—সবকিছু আসলে আমার একারই ছিল।”
শব্দগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু তাদের ভেতরে জমে থাকা নীরব ব্যথা স্পষ্ট।
সে আবার লিখল—
— “নিরব… নামটা হয়তো তেমন কিছু না, কিন্তু আমার কাছে একসময় পুরো পৃথিবী ছিল।”
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম—
— “সে কি… তোমাকে
কষ্ট দিয়েছে?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে লিখল—
— “কষ্টটা দিলে হয়তো সহজ হতো… সে শুধু বদলে
গেল।”
— “আর আমি বুঝলাম,
আমি যাকে চিনতাম—সে আসলে ছিলই
না।”
এইবার কথাগুলোতে অভিযোগ নেই, শুধু ক্লান্তি।
আমি লিখলাম,
— “তুমি কি এখনো তাকে
ভাবো?”
— “ভাবি না… কিন্তু কিছু স্মৃতি নিজে থেকেই ফিরে আসে।”
— “তখন মনে হয়, আমি হয়তো ভুল ছিলাম… মানুষটা না।”
আমি একটু থামলাম। তারপর প্রসঙ্গটা নরমভাবে ঘুরিয়ে দিলাম—
— “আজ যে নীরবতার
কথা বলছিলে… সেটা কি তখন থেকেই?”
সে লিখল—
— “হয়তো… তখন থেকেই শিখেছি, শব্দ সবসময় সত্যি বলে না।”
— “তাই এখন শব্দের চেয়ে অনুভূতিতে বেশি বিশ্বাস করি।”
আমি লিখলাম—
— “তাই তোমার কথা শুনলে মনে হয়, তুমি শুধু বলো না—অনুভব করাও।”
সে হালকা সুরে
উত্তর দিল—
— “তুমি বুঝতে পারো… এটাই আশ্চর্য।”
— “হয়তো আমাদের ভাবনাগুলো কাছাকাছি।”
— “শুধু ভাবনা না… তুমি লেখো, তাই না?”
আমি একটু হেসে লিখলাম—
— “হ্যাঁ, চেষ্টা করি।”
— “বোঝা যায়,” সে লিখল,
— “তোমার কথার ভেতরে একটা ছন্দ আছে… জোর করে না, নিজে থেকেই আসে।”
— “তুমি কি সাহিত্য পড়ো?”
— “পড়ি না বললে ভুল
হবে… বাঁচার জন্য পড়ি।”
— “কিছু লেখা আছে, যেগুলো মানুষকে ভাঙে না—ধরে রাখে।”
— “তুমি নিজেও লিখতে পারো।”
সে একটু থেমে
লিখল—
— “লিখি মাঝে মাঝে… কিন্তু কাউকে দেখাই না।”
— “সব লেখা সবার
জন্য না, সখা।”
আবার সেই শব্দ—“সখা”।
এবার আর অচেনা লাগল
না।
কথা ঘুরতে ঘুরতে আমরা যেন আরেক জগতে ঢুকে গেলাম—
সাহিত্য, অনুভূতি, মানুষ, ভাঙন, আবার উঠে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে দুই
আলাদা পথ থেকে এসে
একই জায়গায় দাঁড়ানোর মতো।
আমি বুঝতে পারছিলাম, সে ধীরে ধীরে
তার ভেতরের দরজাগুলো খুলছে—পুরোটাই নয়, কিন্তু অল্প অল্প করে।
রাত বাড়ছিল।
শেষে সে লিখল—
— “আজকের বিকেলটা… মনে থাকবে।”
আমি লিখলাম—
— “আমারও।”
সে আবার লিখল—
— “সব স্মৃতি ভারী
হয় না… কিছু স্মৃতি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মনে হলো, এই কথাগুলোর ভেতরেই
কোথাও আমাদের সম্পর্কের শুরুটা নীরবে গড়ে উঠছে।
আমি লিখলাম—
— “তাহলে আজকেরটা তেমনই থাক।”
সে শুধু লিখল—
— “হ্যাঁ, সখা।”
চ্যাট শেষ হলো।
কিন্তু কথাগুলো থেকে গেল।
ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।
মনে হচ্ছিল, এই পরিচয়টা সাধারণ
না—
কিছু একটা শুরু হয়েছে। নীরবে, ধীরে, গভীরভাবে।
আর অদ্ভুতভাবে আমি
বুঝতে পারছিলাম—
আমি তার জন্য একটা নাম ভেবে ফেলেছি।
কিন্তু সেটার সময় এখনো আসেনি।

Responses