• Profile photo of Fahmida

      Fahmida posted an update

      6 months ago

      দুবাই ঘুরে আসছে ভারতীয় চাল: মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে শত কোটি টাকা, প্রশ্নবিদ্ধ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া
      সংবাদদাতা-জিহাদুল ইসলাম জিহাদ

      সরাসরি ভারত থেকে না কিনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫০ হাজার মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল আমদানি করছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে প্রতি টন চালে অতিরিক্ত অর্থ গুনছে সরকার, যা জনগণের অর্থের অপচয়।

      খাদ্য নিরাপত্তার অজুহাতে দ্রুত চাল আমদানির উদ্যোগ নিলেও, বাংলাদেশের খাদ্য ক্রয় প্রক্রিয়া আবারও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই/দুবাই) একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে ৫০ হাজার মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল কেনার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ দুবাই চাল উৎপাদনকারী দেশ নয়; বরং তারা নিজেরাই ভারত থেকে আমদানি করে তা পুনঃরপ্তানি করে।

      বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য অধিদপ্তর দুবাই-ভিত্তিক মেসার্স ক্রিডেন্টওয়ান এফজেডসিও (M/s Cridant One FZCO) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই চাল আমদানির চুক্তি অনুমোদন করেছে। চুক্তিমূল্য অনুযায়ী, এই চাল কিনতে বাংলাদেশের মোট খরচ হবে প্রায় ২১৬ কোটি ৪৭ হাজার ৭০ টাকা।

      ঘুরপথের আমদানি রহস্য

      প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই চালের উৎস দেশ হলো ভারত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম অনুযায়ী, ক্রিডেন্টওয়ান এফজেডসিও ভারত থেকে চাল আমদানি করে এবং নিজেদের মুনাফা যোগ করে তা বাংলাদেশে রপ্তানি করছে।

      বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে সরাসরি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুবাইয়ের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হওয়ার ঘটনাটি বেশ বিস্ময়কর। এর ফলে চালের মূল দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশন, পরিবহন খরচ এবং ইউএই’র গোডাউন খরচ, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ বা সরকারি কোষাগারকে বহন করতে হচ্ছে।

      খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে এই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ক্রিডেন্টওয়ান সম্ভবত সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়েছে। তবে এই সর্বনিম্ন দরও যদি সরাসরি উৎস দেশ থেকে কেনার চেয়ে বেশি হয়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

      অর্থনীতিবিদ এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের চুক্তির কারণে চালের আন্তর্জাতিক বাজারে যে দর, তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

      ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, “যখন পণ্যটি ভারত থেকে আসছে, তখন আমরা কেন দুবাইয়ের একটি কোম্পানিকে কমিশন দিচ্ছি? এটি স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এমন চুক্তির সুযোগ খুব কম থাকে, যেখানে সরবরাহকারী দেশ থেকে সরাসরি না কিনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কেনা হয়—বিশেষ করে যখন দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী।”

      তিনি আরও যোগ করেন, “সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তির মাধ্যমে বা উন্মুক্ত টেন্ডারে সরাসরি ভারতীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কিনলে প্রতি টনে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ ডলার সাশ্রয় করা যেত। এই অতিরিক্ত অর্থটা মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা হিসেবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।”

      দুবাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘রি-এক্সপোর্টার’ বা পুনঃরপ্তানিকারক কেন্দ্র হলেও, খাদ্য আমদানির মতো জরুরি ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ব্যবহার নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই ধরনের প্রক্রিয়া সরকারকে খাদ্য আমদানির নামে অতিরিক্ত টাকা খরচ করার সুযোগ করে দেয়, যা বিশেষ মহলের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করে।

      সাধারণ মানুষের করের টাকায় যখন উচ্চমূল্যে ভারতীয় চাল দুবাই ঘুরে বাংলাদেশে পৌঁছাচ্ছে, তখন এই প্রক্রিয়ার পেছনের প্রকৃত কারণ এবং কার লাভ হচ্ছে—সেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা খাদ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত চালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে সরকার কি তবে জনগণের শত কোটি টাকা অপচয়ের পথ খুলে দিল, সেই প্রশ্ন এখন তীব্র হচ্ছে।

      pothiktv
      0 Comments