জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথা ভাঙার গল্প: সমাদৃতার পৌরোহিত্যে টানা তিনবার সরস্বতী পূজা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক: সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, মা সরস্বতী বিদ্যা, সুর ও শিল্পের দেবী। সেই দেবীর আরাধনায় যেখানে জ্ঞানের আলোয় সব অন্ধকার দূর করার প্রার্থনা করা হয়, সেখানে জরাজীর্ণ সামাজিক প্রথা ভেঙে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী সমাদৃতা ভৌমিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩টি মণ্ডপের মধ্যে ৩৬টিতেই যখন পুরুষ পুরোহিতরা মন্ত্রোচ্চারণ করছিলেন, তখন ইংরেজি বিভাগের মণ্ডপে ভক্তিভরে পূজা পরিচালনা করছিলেন এক নারী— সমাদৃতা।

প্রথা বনাম শাস্ত্র: সমাদৃতার লড়াইইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সমাদৃতা ভৌমিক মনে করেন, জ্ঞানার্জনের পথে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। টানা তৃতীয়বারের মতো পৌরোহিত্য করে তিনি প্রমাণ করেছেন, নিষ্ঠা আর শাস্ত্রীয় জ্ঞান থাকলে একজন নারীও ধর্মীয় আচার নিখুঁতভাবে পালন করতে পারেন।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সমাদৃতা বলেন, “আমাদের সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে পৌরোহিত্য কেবল পুরুষদের একচেটিয়া অধিকার। অথচ হিন্দু শাস্ত্র বা বেদে কোথাও বলা নেই যে নারীরা পূজা করতে পারবেন না। আমি সমাজকে এই বার্তাই দিতে চাই যে, যোগ্যতার ভিত্তিতে মেয়েরাও আজ সব জায়গায় সফল। আমি এবার নিয়ে তিনবার পূজা করলাম এবং আগামীতেও এই ধারা বজায় রাখতে চাই।”

উৎসবমুখর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই সরস্বতী পূজা উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিণত হয় এক টুকরো উৎসবে। সাদা ও বাসন্তী রঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে শিক্ষার্থীরা একে একে বিভিন্ন মণ্ডপে ভিড় করেন। পূজা কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল জানান, এ বছর শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পূজা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তার জন্য প্রক্টোরিয়াল বডি ও জাকসু কমিটিকে তিনি বিশেষ ধন্যবাদ জানান।

উপাচার্যের পরিদর্শন শুভেচ্ছা : পূজা মণ্ডপগুলো পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম। তিনি সমাদৃতার এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই প্রগতিশীল চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র। শিক্ষার্থীরা দেবীর আরাধনার পাশাপাশি পাঠ্যজীবনেও সফল হবে এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে অবদান রাখবে এটাই আমার প্রত্যাশা।”

শাস্ত্রীয় বিধান সমাপ্তি: মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের এই তিথিতে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে দেবীর আবাহন করা হয়। অঞ্জলি শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয় প্রসাদ। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে সমাদৃতার এই পৌরোহিত্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবং নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

Related Articles

পুর্নজন্ম কি বৈজ্ঞানিক ভাবে সম্ভব? — একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ

মানব ইতিহাস জুড়ে মানুষের মৃত্যু ও মৃত্যুর পর কী হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বহু ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা চেষ্টা করেছে। অতীতে জীবনের পরের ধাপে…

জুলাই বিপ্লবের সাদিম কায়েম এর যে কাহিনী সবার জানা প্রয়োজন

জুলাই বিপ্লব নিয়ে ইয়েনি সাফাককে (তুরস্কের গণমাধ্যম) একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জুলাই বিপ্লবের নেতা সাদিক কায়েম। তিনি ব্যাখ্যা করছেন, কীভাবে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে…

হাইনান এক্সপো ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের প্রবেশদ্বার

ষষ্ঠ চীন আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্য মেলা (হাইনান এক্সপো ২০২৬) আমি মোঃ জাহিদ হাসান নিরব চীন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সানিয়া ইনস্টিটিউটের) এমবিএ  ছাত্র হওয়ার সুবাদে সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ…

অন্ধকার ও আলোকরেখা: নারীর অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের এক কঠিন বছর

২০২৫ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর অবস্থান নিয়ে এক গভীর দ্বন্দ্বের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আলোচিত হয় নারীর কমিশনের সুপারিশ, হেনস্তা করা হয় কমিশনের সদস্যদের…

Responses