শতাব্দীর ভুল ধারণা ভেঙে দিল গবেষণা: শুক্রাণু নয়, ডিম্বাণুই চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচন করে বিজয়ী!

বিজ্ঞান ডেস্ক | জুলাই ২০২৫
প্রাচীনকাল থেকে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—ডিম্বাণু নিষ্ক্রিয়ভাবে অপেক্ষা করে আর লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু একসাথে ছুটে চলে সেই ‘গন্তব্যে’ পৌঁছানোর জন্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যে শুক্রাণু প্রথম পৌঁছায়, সেই-ই বিজয়ী। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিজ্ঞানের আধুনিক ব্যাখ্যা বলছে, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
সায়েন্স জার্নালিস্ট স্টারে ভারটান তার নতুন বই “The Stronger Sex: What Science Tells Us About the Power of the Female Body” (২০২৫)-এ তুলে ধরেছেন—ডিম্বাণু নিজেই বেছে নেয় কোন শুক্রাণু তার ভেতরে প্রবেশ করবে এবং কোনটি হবে ভবিষ্যৎ সন্তানের পিতা।
- স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ডিম্বাণু এমন একটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা নির্দিষ্ট শুক্রাণুর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
- গবেষণায় দেখা গেছে, ডিম্বাণু কখনো কখনো তার সঙ্গীর শুক্রাণুর বদলে অন্য পুরুষের শুক্রাণুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, কারণ হয়তো সেই শুক্রাণুটি আরো জিনগতভাবে উপযুক্ত।
গবেষকরা বলেন,
“ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া নির্ভর করে নারীর ও পুরুষের নির্দিষ্ট পরিচয়ের ওপর।”
অর্থাৎ, ডিম্বাণু কেবল ‘প্রথম আগত’ নয়, বরং সবচেয়ে উপযোগী শুক্রাণু ‘নির্বাচন’ করে।
যদিও ১৯৮০’র দশকেই প্রথম এই তথ্য উঠে আসে যে, ডিম্বাণুই সক্রিয়ভাবে শুক্রাণু নির্বাচন করে—তবুও ‘দৌড়ানো শুক্রাণু ও নিষ্ক্রিয় ডিম্বাণু’ এই ভুল গল্পই অধিকাংশ জৈববিজ্ঞানের পাঠ্যে রয়ে গেছে।
নারীবাদী জীববিজ্ঞানি এমিলি মার্টিন এবং এভলিন ফক্স কেলার দেখিয়েছেন,
“জীববিজ্ঞানে অনেক তথাকথিত নিরপেক্ষ ব্যাখ্যাই আসলে লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।”
এমনকি ২০১৭ ও ২০১৯ সালের নতুন গবেষণাগুলোকেও ‘অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এগুলোর ভিত্তি অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ডিম্বাণু ও ভ্রূণকে নিজের শরীরে ধারণ করে। ফলে পরিবেশ-নির্ভর নয়, বরং নারীর অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা ও জিনগত বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রাণীরাজ্যে মাছ, ব্যাঙ, কচ্ছপরা শত শত ডিম দেয় এবং সেখানে সংখ্যাই বড় শক্তি।
কিন্তু মানুষের মতো প্রাণীরা সংখ্যার চেয়ে গুণমানের উপর জোর দেয়। তাই কম সন্তান, কিন্তু উন্নত প্রজননই মূল লক্ষ্য।
- গবেষকরা IVF ক্লিনিক থেকে সংগ্রহ করা ডিম্বাণু ও শুক্রাণু নিয়ে পরীক্ষা করেন।
- প্রতিটি পরীক্ষায় দুটি আলাদা দম্পতির শুক্রাণু একাধিক ডিম্বাণুর ফোলিকুলার ফ্লুইডে রাখা হয়।
- দেখা যায়, ডিম্বাণুরা নির্দিষ্ট শুক্রাণুর প্রতি বেশি সাড়া দিচ্ছে—এমনকি কখনো তা নিজের সঙ্গীর নয়।
এই গবেষণা ও বইটি আবারও তুলে ধরেছে যে নারীর দেহ নিষ্ক্রিয় নয়, বরং জন্মদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা পালন করে।
‘শুক্রাণুর প্রতিযোগিতা’ নয়—ডিম্বাণুই সিদ্ধান্ত নেয় কার সাথে সে নতুন জীবনের সূচনা ঘটাবে।
এই তথ্য নারীর প্রজননক্ষমতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাবে এবং ভবিষ্যতের সন্তান ধারণ ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে।
📚 তথ্যসূত্র:
- Starre Vartan: The Stronger Sex (Seal Press, 2025)
- LiveScience Article
- Stockholm & Manchester University Research, 2020
- Labroots, Ms. Magazine (2024), UVA Research Report (2019)

Responses