কৃষকের সংকট ও নীতিনির্ধারণের নীরবতা: এখনই সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ জরুরি
লিটন হোসাইন জিহাদ: দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ইস্যুতে সরব আলোচনা—পরিচয়ের বিতর্ক, নীতির পরিবর্তন, অবকাঠামোগত পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সংস্কার। কিন্তু এই তর্ক-বিতর্কের ভিড়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই আড়ালে সরে যাচ্ছে: দেশের কৃষক কতটা নিরাপদ, এবং তাদের টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটা দৃশ্যমান?
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এখনও কৃষি। জাতীয় আয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় কৃষকের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্ত আঘাতে এই খাত ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। মাঠপর্যায়ের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেক কৃষক ফসল কাটার আগেই সম্পূর্ণ ক্ষতির মুখে পড়েছেন—যা শুধু একটি মৌসুম নয়, পুরো বছরের অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিচ্ছে।
একজন কৃষকের জন্য এই ক্ষতি কেবল উৎপাদনের ব্যর্থতা নয়; এটি ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা, পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে সংকট এবং ভবিষ্যৎ আবাদে অনিশ্চয়তার প্রতীক। অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ইতোমধ্যেই উচ্চমূল্যের বীজ, সার ও কীটনাশকের চাপে ন্যুব্জ। এর সঙ্গে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যুক্ত হয়, তখন তাদের সামনে টিকে থাকার পথ কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠছে—
প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির নির্ভুল ও দ্রুত জরিপ কি সম্পন্ন হচ্ছে? মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ধীরগতি ও অসামঞ্জস্য প্রায়ই সহায়তা কার্যক্রম বিলম্বিত করে, যা ক্ষতিকে আরও গভীর করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, ঘোষিত প্রণোদনা ও ভর্তুকি বাস্তবে কতটা কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে? প্রশাসনিক জটিলতা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে এই সহায়তাকে সীমিত করে দেয়।
তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার ছাড়া এই সংকটের পুনরাবৃত্তি রোধ সম্ভব নয়।
চতুর্থত, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর? উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য না পেলে কৃষক ক্রমেই নিরুৎসাহিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
এই পরিস্থিতিতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত ও সরাসরি আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে পুনঃঋণ সুবিধা প্রদান, ভর্তুকিমূল্যে বা বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ, এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কার্যকর মনিটরিং জোরদার করা—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন। পাশাপাশি কৃষি বীমার বিস্তার, ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, এবং জলবায়ু উপযোগী ফসলের সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
নীতিনির্ধারণে কৃষিকে প্রান্তিক নয়, কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ কৃষক কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠী নয়; তারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। তাদের সংকট উপেক্ষা করা মানে জাতীয় স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।
এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি সময় থাকতে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, নাকি আলোচনার ভিড়ে কৃষকের এই নীরব সংকট আরও গভীর হবে? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

Responses