সরাইলের স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়মের অভিযোগ: চিকিৎসক সংকট, দুই বছর ধরে অচল জেনারেটর, ওষুধ বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন (১ম পর্ব)

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয়শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। কিন্তু চিকিৎসক ও জনবল সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় সেবার সীমাবদ্ধতা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগের কারণে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছেন রোগী ও স্বজনরা।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য আদায়, সরকারি কাজে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততা, হাসপাতালে ওষুধ থাকার পরও রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সেটির ব্যবহার সীমিত বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটর অচল থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় বাড়তি দুর্ভোগে।
কাগজে চিকিৎসক, বাস্তবে সংকট
৫০ শয্যার সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম শ্রেণির ৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৬ জন। তবে এই ১৬ জনের মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসক ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। আরও দুইজন চিকিৎসককে সরাইলে পদায়ন করা হলেও তারা এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি।
ফলে কাগজে চিকিৎসকের সংখ্যা ১৬ জন দেখালেও বাস্তবে নিয়মিত চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকের সংখ্যা আরও কম।
অন্যদিকে হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, চক্ষু ও ইএনটি বিভাগের পদ থাকলেও বর্তমানে এসব বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত নেই বলে জানা গেছে।
এর ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের বাধ্য হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
সরাইল সদর এলাকার নাথপাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেল মিয়া (৫০) বলেন,
“চিকিৎসক কম থাকায় আমরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছি না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে এসে জানতে পারলাম এখানে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ নেই। তাই বাধ্য হয়ে জেলা শহরে যেতে হচ্ছে।”
দেওড়া গ্রামের রোকেয়া বেগমও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে আসা এক রোগী বলেন,
“আমার মেয়ে অসুস্থ। সরকারি হাসপাতালে এসেও জানতে পারলাম মেডিসিন বিশেষজ্ঞ নেই। সাধারণ মানুষ তাহলে কোথায় যাবে?”
প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী, চাপ সামলাতে হিমশিম
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল কম হওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
তৃতীয় শ্রেণির ৮০ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৯ জন কর্মরত থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল পর্যাপ্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন,
“প্রতিদিন হাসপাতালে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সীমিত জনবল দিয়েই আমরা আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় চাপ সামলাতে কষ্ট হয়।”
তিনি জানান, শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
সরকারি কাজে বহিরাগত ব্যক্তি, উঠেছে প্রশ্ন
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোগী ও স্থানীয়রা।
সরেজমিনে হাসপাতালের ওষুধ বিতরণকেন্দ্রে সরকারি কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে বসে কাজ করতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি কার্যক্রমে ওই ব্যক্তি কীভাবে এবং কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি জানেন বলে জানান। তার দাবি, ওই ব্যক্তি শিক্ষিত এবং কাজটি করায় আপাতত কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
তবে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পরিবর্তে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে দিয়ে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩ টাকার টিকিট ৫ টাকায় বিক্রির অভিযোগ
হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট নিয়েও রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
কয়েকজন রোগীর অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ৩ টাকার টিকিটের জন্য তাদের কাছ থেকে ৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলেও অভিযোগের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
হাসপাতালে ওষুধ আছে, তবুও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে?
সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ওষুধ বিতরণ নিয়ে।
রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে একাধিক ওষুধ লেখা থাকলেও হাসপাতালের কাউন্টার থেকে সব ওষুধ দেওয়া হয় না। অনেক সময় এক বা দুই ধরনের কমদামি ওষুধ দিয়ে বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়।
এক রোগী আক্ষেপ করে বলেন,
“আমরা দরিদ্র মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই বলেই সরকারি হাসপাতালে আসি। এখানে এসে যদি প্রেসক্রিপশনের ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালের সুবিধা কী?”
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৬০ টাকা গাড়িভাড়া খরচ করে হাসপাতালে এসে তিনি মাত্র ১০ টাকা মূল্যের একটি অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট পেয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ হাসপাতালে মজুত রয়েছে।
এ বিষয়ে ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে গ্যাসের ওষুধ পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে প্রেসক্রিপশনে থাকা অন্যান্য ওষুধ রোগীদের কেন দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের ওষুধের মজুত, বিতরণ এবং রোগীদের কাছে সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে যাচাই করা উচিত।
আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, কিন্তু ব্যবহার সীমিত
হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উন্নয়ন করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, অনেক সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের ব্যবস্থা থাকলেও সেটি বেশিরভাগ সময় কার্যকর থাকে না। বছরে সীমিতসংখ্যক সিজারিয়ান অপারেশন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও কেন নিয়মিতভাবে এসব সুবিধা ব্যবহার করা যাচ্ছে না?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যাখ্যা এবং অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
দুই বছর ধরে অচল জেনারেটর, বিদ্যুৎ গেলেই দুর্ভোগ
বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জেনারেটর থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে অচল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে জেনারেটরটি অকেজো অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগীদের চলাচল এবং জরুরি সেবায় সমস্যা সৃষ্টি হয়।
প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসা একটি সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটর অচল থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা, ২০১২ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৫ সালে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১২ সালে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।
কিন্তু দীর্ঘদিনেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবল নিশ্চিত না হওয়ায় হাসপাতালের অবকাঠামো ও চিকিৎসা সুবিধার পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না উপজেলার মানুষ, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, দুইজন চিকিৎসককে পদায়ন করা হলেও তারা এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি। দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ করা সম্ভব হলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য আদায়, সরকারি কাজে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততা, ওষুধ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, সীমিত অপারেশন থিয়েটার কার্যক্রম এবং দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটর অচল থাকার বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের প্রশ্ন, প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়শ রোগীর সেবা দেওয়া একটি সরকারি হাসপাতালে যদি প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকে, বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু না হয় এবং রোগীদের ওষুধের জন্য বাইরে ছুটতে হয়, তাহলে প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হবে কীভাবে?
সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ।
চলবে

Responses