ধ্রুপদী সঙ্গীতে অতীত যন্ত্রের ব্যবহার: কেন এনালগ নস্টালজিয়ার চেয়ে এটি আলাদা?
বিনোদন ডেস্ক: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৩৫ পূর্বাহ্ন
বর্তমান সঙ্গীত জগতে পুরোনো প্রযুক্তির প্রতি একধরনের নস্টালজিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সিক্সটিজের পপ বা সেভেন্টিজের ডিসো ঘরানার অনুরাগী কিংবা ভিনাইল রেকর্ড ও ক্যাসেটে গান শোনার প্রবণতা শ্রোতাদের মধ্যে ফিরে আসছে। প্রযুক্তিবিদ বা সঙ্গীতপ্রেমীরা প্রায়শই দাবি করেন যে ভিনাইলের অনুলিপিতে বিশেষ উষ্ণতা ও শব্দের সমৃদ্ধি থাকে। তবে প্রযুক্তিগত বা শাব্দিক দিক থেকে ভিনাইল বা ক্যাসেট আধুনিক হাই-রেজোলিউশন স্ট্রিম থেকে উন্নত নয়। মূলত আজকের ডিজিটাল ও অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন শব্দ ব্যবস্থার যুগে কিছুটা অমসৃণ ও মানবীয় ছোঁয়া পাওয়ার আকুলতা থেকেই মানুষ এসব এনালগ মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে।
রেকর্ডিং শিল্পে যা এখন নতুন করে শুরু হয়েছে, ধ্রুপদী সঙ্গীতে তা কয়েক দশক ধরে চলে আসছে। সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীতবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরেই তাদের পঠিত ও পরিবেশিত সঙ্গীতের মূল উৎস সন্ধানে মনোযোগী হয়েছেন। দ্বাদশ শতকের জার্মানির হিলডেগার্ড অব বিঙ্গেন কিংবা উনিশ শতকের ভিয়েনার বিথোভেন ও শুবার্টের যুগে যন্ত্রের গঠন ও পরিবেশনার ধারা কেমন ছিল, তা জানার চেষ্টা করে আসছেন তারা। ১৯৭০-এর দশকে ডেভিড মানরো টেলিভিশন, রেডিও ও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় ও রেনেসাঁ যুগের বাদ্যযন্ত্র যেমন শাওম (shawm) এবং ক্রামহর্ন (crumhorn) মূলধারায় জনপ্রিয় করে তোলেন। পরবর্তীতে রজার নরিংটন, জন এলিয়ট গার্ডিনার এবং নিকোলাউস হারননকোর্টসহ অন্যান্য সঙ্গীতজ্ঞরা প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র ও গবেষণা ভিত্তিক চর্চাকে চেম্বার গ্রুপ ও সিমফনি অরকেস্ট্রায় ছড়িয়ে দেন।
তবে ভিনাইল বা ক্যাসেটের প্রামাণিকতার (authenticity) দাবি কিছুটা অতিরঞ্জিত হলেও প্রাচীন ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। প্রাচীনকালের বাদ্যযন্ত্রগুলোর শব্দ ও অভিব্যক্তির ধরন আধুনিক যন্ত্রের তুলনায় ভিন্ন। আঠারো শতকে বাখ যখন হার্পসিকর্ড (harpsichord) যন্ত্রের জন্য সুর রচনা করতেন, তার শব্দ ছিল আজকের আধুনিক গ্র্যান্ড পিয়ানোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। হার্পসিকর্ডের তারে আঘাতের পর সুর খুব দ্রুত বিলীন হয়ে যায়, অথচ আধুনিক স্টেইনওয়ে পিয়ানো দীর্ঘ সময় সুরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। একইভাবে, বর্তমানে যেকোনো স্কেলে বাজানো ফ্রেঞ্চ হর্ন সহজলভ্য হলেও অতীত প্রজন্মে নির্দিষ্ট নোট বাজাতে যন্ত্রের অংশ পরিবর্তন করতে হতো। তারের তৈরি সাধারণ সুতা বা গুটের (gut) ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন রিড ব্যবহারের ফলে তৎকালীন যন্ত্রগুলোতে টিউনিং ঠিক রাখাও একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।
প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের এই ভিন্নতা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে খারাপ কিছু নয়, বরং তা শিল্পীদের নতুনভাবে বাজানোর সুযোগ করে দেয় এবং শ্রোতাদের জন্য অনুভূতির নতুন দুয়ার খুলে দেয়। বাখের সুর যখন আধুনিক বিশাল অরকেস্ট্রা ও ভিফ্রেটো স্ট্রিংয়ে বাজানো হয়, আর যখন তৎকালীন ছোট আকারের প্রাচীন যন্ত্রের দল দ্বারা পরিবেশিত হয়, তখন কেবল শব্দের নয়, বরং অর্থের ও অনুভূতির এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। যেমন ১৯৭৯ সালে কার্ল রিখটারের পরিচালনায় বাখের ‘ম্যাথিউ প্যাশন’-এর সূচনা এবং ২০০৩ সালে পল মাক্রিশের পরিচালনায় একই পরিবেশনা সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রদান করে। রিখটারের পরিবেশনা ছিল স্মৃতিস্তম্ভের মতো বিশাল, অন্যদিকে মাক্রিশের দ্রুতগতির পরিবেশনা প্রতিটি শ্রোতাকে নাটকের অংশ করে তোলে।
পিয়ানোবাদক ভিকিঙ্গুর ওলাফসন উল্লেখ করেছেন যে, পুরোনো যন্ত্রে বাজালেই বাখ, বিথোভেন বা মাহলার যেভাবে শুনেছিলেন হুবহু তা পুনর্নির্মাণ সম্ভব নয় এবং সেটি মূল উদ্দেশ্যও নয়। কারণ বর্তমান যুগের শ্রোতাদের শ্রবণ সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিবিসি প্রম্পসের শেষদিকের কনসার্টগুলোতে এই ঐতিহাসিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করছে। ‘আরকাঞ্জেলো’-র শিল্পীরা বাখের ‘বি মাইনর মাস’ মূল বাদ্যযন্ত্রে পরিবেশন করবেন। এছাড়া মাহলার একাডেমি অরকেস্ট্রা ১৯০০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েনা অপেরার জন্য মাহলারের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী তৈরি যন্ত্রের স্পেসিফিকেশন মেনে মাহলারের নবম সিমফনি পরিবেশন করবে।
ঐতিহাসিক বাদ্যযন্ত্রে আধুনিক যন্ত্রের চেয়ে সুরের ভিন্নতা, রঙের ভিন্নতা এবং লিরিক্যাল তীব্রতা বেশি থাকে। এটি গানের আবেগময় অসম্পূর্ণতা ও জটিলতাগুলোকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম। এই ধরনের একক জীবন্ত পরিবেশনা কেবল অতীতকে ফিরিয়ে আনার জন্য নয়, বরং বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গীতশক্তি ও মানবীয় আবেগকে জীবন্ত করে তোলার এক বিশেষ মাধ্যম।
সূত্র: The Guardian – Culture

Responses