POTHIKTV

নীরব ভালোবাসার কাব্য: রাত জাগা কান্না, মায়ের নিভৃত সংগ্রাম ও বাবার অদৃশ্য ছায়া

নিঝুম রাত। ঘড়ির কাঁটা জানান দেয় পুরো শহর এখন নিবিড় ঘুমে মগ্ন। পৃথিবীর সমস্ত কলরোল যেখানে থমকে দাঁড়ায়, সেখানেই একটি অন্ধকার ঘরে রচিত হয় মাতৃত্ব আর পিতৃত্বের এক অনবদ্য মহাকাব্য। ঘরের কোণে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা আবছা আলোয় ভেসে ওঠে রাতজাগা মায়ের ক্লান্ত অবয়ব। কোলজুড়ে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটি ঘুমের ঘোরেও অবিরত মায়ের দুধ খুঁজে চলেছে। ক্লান্ত […]

নীরব ভালোবাসার কাব্য: রাত জাগা কান্না, মায়ের নিভৃত সংগ্রাম ও বাবার অদৃশ্য ছায়া

নিঝুম রাত। ঘড়ির কাঁটা জানান দেয় পুরো শহর এখন নিবিড় ঘুমে মগ্ন। পৃথিবীর সমস্ত কলরোল যেখানে থমকে দাঁড়ায়, সেখানেই একটি অন্ধকার ঘরে রচিত হয় মাতৃত্ব আর পিতৃত্বের এক অনবদ্য মহাকাব্য। ঘরের কোণে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা আবছা আলোয় ভেসে ওঠে রাতজাগা মায়ের ক্লান্ত অবয়ব। কোলজুড়ে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটি ঘুমের ঘোরেও অবিরত মায়ের দুধ খুঁজে চলেছে। ক্লান্ত মা যখন পরম মমতায় অবুঝ সন্তানকে একটু দূরে সরিয়ে সোজা হয়ে শুতে যান, ঠিক তখনই শিশুটি আঁকুপাঁকু করে ফুঁপিয়ে ওঠে। চোখ বন্ধ রেখেই সে যেন অনুভব করে মায়ের স্পর্শের দূরত্ব। অন্ধকারের মধ্যেও ব্যাকুল হয়ে সে খুঁজে নেয় মায়ের উষ্ণ বুক আর চেনা হৃদস্পন্দন।

বাইরের জগত যখন শান্ত, তখন ঘরের ভেতর মা লড়ে যান এক অদৃশ্য শারীরিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কোনো সরাসরি খবর কোথাও ছাপা হয় না। পুরো রাত তাকে কাটাতে হয় প্রায় একই অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে। না পারেন ঘাড় সোজা করতে, না পারেন আরাম করে শয়ন করতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই অবস্থানে থাকায় মায়ের পিঠের মাংসপেশি শক্ত হয়ে আসে, ঘাড়ে ও কোমরজুড়ে নেমে আসে তীব্র যন্ত্রণা। সন্তান যেন জেগে না ওঠে, সেই ভয়ে মা নড়াচড়াও বন্ধ রাখেন। এক হাতে পরম যত্নে ধরে রাখেন কলিজার টুকরোটিকে, আর অন্য হাতে চেপে রাখেন নিজের শরীরের তীব্র কষ্ট।

তবে এই মধ্যরাতের সংগ্রামে মা কিন্তু একা নন; এই গল্পের নেপথ্যে জড়িয়ে থাকে আরেকজন মানুষের নীরব উপস্থিতি—সন্তানের বাবা।

সারাদিন সংসারের চাকা ঘোরাতে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে উপার্জনের ক্লান্তি কাঁধে নিয়ে রাতে বাড়ি ফেরেন বাবা। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লেও, মধ্যরাতে সন্তানের কান্নায় কিংবা স্ত্রীর নীরব কষ্টের শব্দে বাবার ঘুমও স্থায়ী হতে পারে না। মা যখন কোলের সন্তানকে আগলে রাখতে গিয়ে যন্ত্রণায় অস্থির হন, পাশে থাকা বাবাও তখন নীরবে ছটফট করেন। কখনো মায়ের ঘাড়ে পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে ব্যথার উপশম খোঁজার চেষ্টা করেন, কখনোবা মাঝরাতে ক্লান্তি ভুলে সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে পায়চারি করেন—যাতে মা অন্তত কয়েক মিনিটের জন্য একটু ঘাড় সোজা করতে পারেন, একটু চোখ বুজতে পারেন।

পরদিন সকালেই আবার বাবাকে ছুটতে হবে জীবিকার তাগিদে, অথচ নিজের রাতের ঘুমটুকু বিসর্জন দিতেও তার দ্বিধা নেই। মায়ের মতো প্রকাশ্য না হলেও, বাবার এই অদেখা অবদান আর রাত জাগা চোখের নীরব ত্যাগ পুরো সংসারকে আগলে রাখে।

সকালের আলো ফুটলে যখন অবুঝ শিশুটি চোখ মেলে মা-বাবার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে অমলিন হাসি উপহার দেয়, তখন সেই এক হাসিতেই মিলিয়ে যায় দুজনের সমস্ত ক্লান্তি, সব শারীরিক যন্ত্রণা।

আসলে সন্তানকে বড় করে তোলার এই ভ্রমণটি কোনো একক পথচলা নয়; এটি মা ও বাবার যৌথ ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কোনো পরিমাপে এই কষ্টের হিসাব মেলাবে কে? কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়া কেবলই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মা-বাবার এই রাত জাগা ও কষ্ট সহ্য করা—ইহাই পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ভালোবাসা।

বিশেষ কলাম | মো. মনির হোসেন

1
0 comments·0 shares