প্রকৃতির টানে, সবুজের পথে: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুরু হলো দশ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলা ২০২৫
পরিবেশ সচেতনতার মহোৎসব নগরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, ধুলোবালি আর কংক্রিটের জঞ্জালে ঢাকা জনজীবনে যখন প্রকৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে, তখনই সবুজের নবদিগন্ত উন্মোচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে শুরু হয়েছে দশ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলা ২০২৫।
জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগে পৌর মুক্তমঞ্চ চত্বরে আয়োজিত এই মেলা যেন শুধুই বৃক্ষ প্রদর্শনীর একটি আয়োজন নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে পরিবেশ সচেতনতা ও সবুজ বিপ্লবের এক অনন্য নিদর্শন।
সকালের প্রথম সূর্যের আলোর সঙ্গে সঙ্গেই মুখর হয়ে ওঠে মেলার চত্বর। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন হাতে ব্যাগ নিয়ে, গাছের চারা কিনতে, পরামর্শ নিতে কিংবা শুধুই দেখতে।
স্টলগুলোতে সাজানো হয়েছে হাজারো প্রজাতির গাছের চারা—ফলদ, বনজ, ঔষধি, ফুলের গাছসহ বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির গাছও স্থান পেয়েছে এবারের আয়োজনে। প্রতিটি চারা যেন একটি প্রতিশ্রুতি—পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার, আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার।
মেলায় শুধু গাছের বেচাকেনা নয়, পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আলোচনা সভা, পোস্টার প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমেরও আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে জেনেছে, অংশ নিয়েছে নানা প্রতিযোগিতায়, এবং শিখেছে কীভাবে একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না, বরং পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে।
পর্যটকদের চোখে এই মেলা যেন এক টুকরো সবুজ স্বপ্ন। কেউ চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ির জন্য, কেউবা শহরের ছাদবাগান বা বারান্দার কোণে বসিয়ে দিচ্ছেন একটি নতুন প্রাণ। ছোট্ট একটি গাছ থেকেই শুরু হতে পারে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার যাত্রা—এই বার্তাটি যেন প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। আয়োজকেরা বলছেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেই গাছকে লালন-পালন করতে হবে সন্তানের মতো করেই। আর তাই মেলা থেকে চারা কেনার সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে যত্নের দিকনির্দেশনাও—মাটি নির্বাচন, পানি দেওয়ার নিয়ম, আলো-বাতাসের প্রয়োজনীয়তা থেকে শুরু করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক উপায়।
বৃক্ষমেলা যেন একবারে শহরের সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। অনেকেই পরিবার নিয়ে আসছেন, সময় কাটাচ্ছেন, গাছের ছবি তুলছেন, গল্প করছেন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে বন্ধন গড়ার। এটি কেবল একটি মেলা নয়, বরং এক ধরণের আন্দোলন—একটি শহরকে, একটি প্রজন্মকে সবুজের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই বৃক্ষমেলা পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। শহরের প্রতিটি মানুষকে গাছ লাগাতে, গাছকে ভালোবাসতে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা দিচ্ছে এ আয়োজন। বৃক্ষ শুধু অক্সিজেন দেয় না, দেয় জীবনের আশা, দেয় শান্তি, দেয় ছায়া। এই মেলা তাই একটি বার্তা, একটি ডাক—সবুজের দিকে ফিরো, প্রকৃতির কোলে ফিরে চলো।

Responses