প্রতারণার ভারে নুয়ে পড়া ভালোবাসা :লিটন হোসাইন জিহাদ
ভালোবাসার যে জায়গাটা একদিন ছিল স্বচ্ছ নদীর মতো, সেখানে এখন জলের রং গভীরভাবে বদলে গেছে। একসময় যেখানে আলো পড়লে তরঙ্গগুলো রূপোর মতো ঝিকিমিকি করত, আজ সেখানে স্তব্ধ হয়ে জমে আছে ভারী, নাদুস নুদুস যন্ত্রণা—নরম নয়, বরং অস্বস্তিকরভাবে ঘন, যেন নিঃশ্বাসটুকুও আটকে দেয়। এই রূপান্তর হঠাৎ কোনো ঝড়ে আসেনি; এসেছে ধীরে, অদৃশ্য ক্ষয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায়—একেকটা বিশ্বাস ভেঙে পড়ার মৃদু অথচ ধারালো শব্দে গড়ে উঠেছে এই ভাঙা দৃশ্যপট।
আমি কখনো কল্পনাও করিনি, ভালোবাসার গভীর ভেতরেই এমন নিঃশব্দ ভাঙন লুকিয়ে থাকতে পারে। তুমি একসময় ছিলে সেই নরম বিকেলের আলো, যার ছায়া আমার প্রতিটি ভাবনার ভেতর মিশে থাকত। অথচ আজ মনে হয়, সেই আলো ছিল এক সূক্ষ্ম প্রতারণার পর্দা—যেখানে সত্যকে ইচ্ছে করে ঢেকে রাখা হয়েছিল এক অদৃশ্য অন্ধকারে। প্রতিটি কথার আড়ালে, প্রতিটি আশ্বাসের ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসমাপ্ত ফাঁকি—যা আমি দেখিনি, কিংবা হয়তো দেখতে চাইনি।
এখন আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তা কোনো নাটকীয় বিচ্ছেদের চূড়া নয়; বরং এক দীর্ঘ ক্লান্তির নিঃশেষ প্রান্তর। এখানে আর কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, নেই তোমাকে ফিরে পাওয়ার কোনো ব্যাকুলতা। আছে শুধু এক নিঃশব্দ উপলব্ধি—কিছু পথ একবার ভেঙে গেলে, তা আর কখনো আগের মতো করে জোড়া লাগে না। ভালোবাসার মাটি যখন প্রতারণার ভারে শক্ত হয়ে যায়, সেখানে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে গেলে আঙুলে শুধু রক্ত ঝরে।
চারপাশে তাকালে দেখি, সবকিছুই যেন একই রয়ে গেছে—সেই পথ, সেই আকাশ, সেই বিষণ্ণ বিকেল। শুধু বদলে গেছি আমি। আমার ভেতরের সেই নির্ভার বিশ্বাস, যে সহজে ডানা মেলত, সে আর নেই। তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এক গভীর সতর্ক নীরবতা—যে প্রতিটি নতুন অনুভূতিকে দূর থেকে দেখে, কাছে আসতে দেয় না, ছুঁতে ভয় পায়।
আমি এখন আর কিছুই চাই না—না কোনো ব্যাখ্যা, না কোনো প্রত্যাবর্তন। শুধু চাই এই জমাট বাঁধা স্মৃতির গহ্বর থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করতে। প্রতারণার প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি ফেলে যাওয়া শব্দ থেকে নিজেকে আলাদা করতে। কারণ আমি বুঝে গেছি—কিছু গল্প শেষ হয় না কোনো জোরালো সমাপ্তিতে; তারা নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে, নিজের ভেতরেই নিঃশেষ হয়ে যায়।
আর সেই নিঃশেষ হওয়ার গভীরতাতেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত মুক্তি—
এক নতুন শূন্যতার দরজা খুলে যায় সেখানে,
যেখানে ভাঙা প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি নেই,
শুধু আছে নীরবে বেঁচে থাকার বিস্তীর্ণ অবকাশ।

Responses