Education ডেস্ক: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:০৪ পূর্বাহ্ন
প্রযুক্তির ভিড়ে বই পড়ার অভ্যাসে যে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে, তা কাটিয়ে তুলতে এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সিঙ্গাপুর সরকার। নাগরিকদের বই পড়ার দিকে আবার ফিরিয়ে আনতে সরাসরি নগদ টাকা দেওয়ার একটি সরকারি কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পে নাগরিকেরা একটি সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজেদের বই পড়ার সময় নথিভুক্ত বা লগইন করে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থ পুরস্কার হিসেবে উপার্জন করতে পারবেন।
সিঙ্গাপুরের এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ১৫ মিনিটের অন্তত ৫০টি সেশন বই পড়ে লগইন করলে একজন নাগরিক ১ সিঙ্গাপুরি ডলার (যা প্রায় ০.৫৯ ব্রিটিশ পাউন্ডের সমপরিমাণ) পাবেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি দিনে কেবল একটি পড়ার সেশনই নথিভুক্ত করার সুযোগ পাবেন। উপার্জনের হিসাবটি খুব বড় অঙ্কের না হলেও পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আচরণ বিজ্ঞানীরা।
প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লেখা ‘দ্য অ্যানশাস জেনারেশন’ বইয়ের লেখক জোনাথন হাইট জানান, শিশুরা পুরস্কারের প্রতি বেশ সংবেদনশীল এবং অনেকে অর্থের বিনিময়ে প্রেষণা পায়। তাই এই ধরনের উদ্যোগ তরুণদের মাঝে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদি পাঠকেরা বই পড়ার মূল আনন্দটি খুঁজে পান, তবে নগদ টাকা দেওয়া বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের এই অভ্যাস স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক লোরি বারিল এ বিষয়ে বলেন, যেকোনো কাজ ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত করলে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। তবে অর্থের বিনিময়ে পড়তে গেলে অনেকের মনে হতে পারে তারা কেবল বাহ্যিক পুরস্কারের জন্যই পড়ছেন। সেক্ষেত্রে অর্থের প্রণোদনা বন্ধ হলে পড়াও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আসল দেখার বিষয় হলো, আর্থিক পুরস্কার উঠে যাওয়ার পরও মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস বজায় থাকে কি না।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের আচরণগত মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আইভো ভ্লায়েভ উল্লেখ করেন, আচরণ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো প্রণোদনা সবসময় কেবল আর্থিক মূল্যের ওপর নির্ভর করে কাজ করে না। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর পর এক ডলার পাওয়া কোনো বড় অর্থ নয়, তাই এটিকে প্রচলিত আয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে চলবে না। এটি মূলত একটি উদ্দীপক বা ট্রিগার হিসেবে কাজ করে।
অধ্যাপক ভ্লায়েভ আরও জানান, পড়ার সময় লগইন করার পর পয়েন্ট জমা হতে দেখলে পাঠকেরা তাৎক্ষণিক একটি স্বীকৃতি অনুভব করেন। এতে লক্ষ্য অর্জনের তাগিদ তৈরি হয়। আর একবার পড়া শুরু করার পর বইয়ের ভেতরের নিজস্ব আনন্দ বা স্বাতন্ত্র্য পাঠককে ধরে রাখে। মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার তাৎক্ষণিক ডোপামিন পাওয়ার প্রবণতাকে টেক্কা দিতেই এই তাৎক্ষণিক মেথড ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিহেভিয়ারাল ইনসাইটস টিমের শিক্ষা বিষয়ক পরিচালক প্যাট্রিক টেলর এই উদ্যোগের গেমিফাইড বা পয়েন্টভিত্তিক পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। দিনে মাত্র ১৫ মিনিটের সহজ লক্ষ্য, যা যাতায়াত বা ঘুমানোর আগের সময়ের সাথে মিলিয়ে করা সম্ভব, মানুষকে অভ্যাসে ধরে রাখতে বেশি সাহায্য করবে বলে তিনি মনে করেন। পেন্সিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্টন বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ক্যাটি মিলকম্যান এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই উদ্যোগগুলোকে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনা করে দেখা উচিত কোনো পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি কাজ করে।

