চলচ্চিত্র পর্যালোচনা: চায়ের পেছনে উপনিবেশ ও করপোরেট শোষণের করুণ ইতিহাস ‘কিকুয়ু ল্যান্ড’
কেনিয়ার চা বাগানের মনোরম দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্রিটিশ উপনিবেশ ও আধুনিক করপোরেট শোষণের নির্মম সত্য তুলে ধরা হয়েছে ‘কিকুয়ু ল্যান্ড’ প্রামাণ্যচিত্রে।

Entertainment ডেস্ক: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:১৮ পূর্বাহ্ন
কেনিয়ার মধ্যভাগের পার্বত্য অঞ্চল নজরকাড়া বিস্তৃত চা বাগানের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। চোখের সীমানা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই সবুজ বাগানগুলোর বেশিরভাগ শ্রমিকই উঠে এসেছেন কিকুয়ু সম্প্রদায় থেকে, যাদের কৃষিকাজের ঐতিহ্য শতাব্দী প্রাচীন। তবে পরিচালক অ্যান্ড্রু হ্যারিসন ব্রাউন ও বি ওয়াঙ্গনডুর তৈরি ‘কিকুয়ু ল্যান্ড’ প্রামাণ্যচিত্রে এই চোখজুড়ানো রূপময় দৃশ্যপটই চরম দুঃখ-কষ্ট আর শোষণের সমার্থক হয়ে উঠেছে।
প্রামাণ্যচিত্রটির শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে কেনিয়ার ব্রিটিশ উপনিবেশিক গভর্নর ইভলিন বারিংয়ের একটি টেলিভিশন ভাষণের মধ্য দিয়ে। এর মাধ্যমে কেনিয়ায় যুক্তরাজ্যের কৃষিভিত্তিক সাম্রাজ্যবাদী বিকাশের মূল চালিকাশক্তি ও উদ্দেশ্যে আলোকপাত করা হয়েছে। সে সময় কিকুয়ু জনগণকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল এবং তাদের কঠোর পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে উপনিবেশকারীদের পকেট ভারী করা হয়েছিল।
উপনিবেশিক শাসনের রেখে যাওয়া শোষণের এই পথ অনুসরণ করে আজও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো একই ধরনের অসম ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে বি ওয়াঙ্গনডু নিজে পর্দায় উপস্থিত থেকে একাধিক করুণ ও ঐতিহাসিক ঘটনার ইতিবৃত্ত একসঙ্গে বুনে তুলেছেন।
চলচ্চিত্রটিতে উঠে এসেছে যাজক ও সমাজকর্মী মি. মুঙ্গাইয়ের কয়েক দশক ধরে চলা বিচার পাওয়ার লড়াইয়ের গল্প। যিনি নিজের পরিবারের হাতছাড়া হওয়া জমি পুনরুদ্ধারের জন্য একাধিক আইনি লড়াই লড়েছেন। এর পাশাপাশি ওয়াঙ্গনডু চা বাগানের অতীত ও বর্তমানের সাধারণ শ্রমিকদের সাথে কথা বলেছেন, যাদের ওপর চলা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের নির্মম বিবরণী সরকার ও কর্পোরেট নীরবতার আড়ালে ঢাকা পড়েছে।
এখানে কেনিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রের সমালোচকদের দমনে ব্যবহৃত বিভৎস পদ্ধতির কথা প্রকাশ করেছেন। এই সমস্ত সাক্ষাৎকার পুরো প্রামাণ্যচিত্রে ভয়াবহ ভয়ভীতি ও প্রতিশোধের এক আতঙ্কজনক পরিবেশ তৈরি করে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ যেন খোলা নেই।
প্রামাণ্যচিত্রটি এক নাটকীয় মোড় নেয় যখন পরিচালক ওয়াঙ্গনডু তাঁর নিজের পরিবারের এক অস্বস্তিকর সত্য আবিষ্কার করেন। তিনি জানতে পারেন, তাঁর শ্রদ্ধেয় দাদাও ছিলেন একজন নামকরা ভূম্যধিকারী এবং ব্রিটিশ উপনিবেশিক নির্যাতনের অন্যতম অংশীদার। এই মর্মান্তিক উন্মোচন ওয়াঙ্গনডুর সাথে তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তুর মধ্যকার দূরত্ব এক নিমেষে মুছে দেয় এবং উপনিবেশিক অপরাধে পরোক্ষ অংশীদারিত্বের বিষয়টিও ফুটিয়ে তোলে।
বিশ্বজুড়ে যারা চা পান করতে ভালোবাসেন, তাদের উদ্দেশ্যে ‘কিকুয়ু ল্যান্ড’ আহ্বান জানায় যেন তারা ঠান্ডা মাথায় ভাবেন এবং অনুসন্ধান করেন যে তাদের প্রতিদিনের পানীয়টি ঠিক কোথা থেকে এবং কীভাবে আসছে। প্রাক-প্রেক্ষাপট ও শোষণের নানা দিক উন্মোচন করা এই প্রামাণ্যচিত্রটি আগামী ২ অক্টোবর থেকে যুক্তরাজ্যের সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শিত হবে।
