-
মুসলিম উম্মাহর গৌরব ও পতন
ইসলাম সূচনার মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে বাগদাদ‑দিল্লি‑আনাদোলু পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয় এক নতুন সভ্যতা। নবী মুহাম্মদ (সা.)‑এর জীবন, সাহাবাদের পরিশ্রম আর মুচলেকা মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। তারা বিজ্ঞানের আলোতে আলোকিত করে পৃথিবীর একাধিক নগরকে।
কিন্তু আজ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইয়েমেন কিংবা সিরিয়া–পুরো অঞ্চলে টনক নড়ছে না। কেন এমন হলো? কি কারণে মুসলিম মূল্যবোধ, ঐক্য ও জ্ঞানচর্চা একসময়ে দিয়েছিল নেতৃত্ব, আর আজ কেন সারা বিশ্বকেই পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে?
১. মুসলিম উম্মাহর মহান ইতিহাস
১.১. নবী আহলে বাগদাদ: ইসলামের প্রথম মহাসমুন্দর
বাগদাদের আবীর। রুশিদুনায় বাগদাদ হয়েছিল মানবসভ্যতার ভর্তি গ্রন্থাগারের মডেল। চতুর্দিকে ছিল ‘বাইতুল হিকমা’—গবেষণার কেন্দ্রস্থল। ডাক্তার, বিদ্বান, অনুবাদক, রসায়নবিদ, গণিতজ্ঞ–সবাই সেখানে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতেন। হাউস অফ ওয়ারিস, বাগদাদের ৪৬০ টিরও বেশি কাঠামো, লাইব্রেরি ও বিজ্ঞানকেন্দ্র ছিল।
বাইতুল হিকমা বা ‘House of Wisdom’-এ আল-খোয়ারিজমি (গণিত), ইবনে হাইথাম (চোখ‑জ্যোতিস্রষ্টি), আল-রাজি (রসায়ন), ইবনে সিনা (চিকিৎসা) – সবাই এক প্রজন্মে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতেন।
১.২. কোটি‑কোটি ধূসর বই: গণিত ও বিজ্ঞানে অগ্রাধিকার
মৌলিক গণিতে আল-খোয়ারিজমির অবদান আজও মনে রাখা হয়: এলজেব্রা অর্থাৎ ‘al-jabr’ শব্দটি তার থেকেই এসেছে। আধুনিক গণিত ও কম্পিউটারের ভিত্তি ঠিক সেখানে বসে। ইবনে হাইথাম তার ‘পূন্যপথী আল-মান্দাইলি’ গ্রন্থে চোখ‑জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগ্রণী হয়ে ওঠেন, আধুনিক অ্যানাটমি ও ভিজ্যুয়াল নান্দনিকতার মডেল তৈরি করেন। ইবনে সিনার ‘কানুন’ আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার পথপ্রদর্শক; সে‑সময়ে একমাত্র এ-ই ‘বিশ্বকোষ’। সবই ছিল মিলনের, যুক্তির, গবেষণার।
১.৩. কবি‑সূফি সাহিত্য ও কর্ডোভা: সুবোধতার শক্তির্ল্য
স্পেনের কর্ডোভা শুরুর দিকে মুসলিম মহার্ঘ কেন্দ্র, যেখানে ইউরোপেও বিজ্ঞান, দর্শন, কবিতা মিলেমিশে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে আকুঁড়ে তুলেছে। রুমি, হাফিজ, সাঈদির শব্দ যেন কবিতার সুন্দর সেতু, যাঁরা ইসলামের প্রেম, বুদ্ধি, ঈশ্বরচেতনাকে নিয়ে এসেছিলেন ‘আল-হিকমা’র ওই ঐশ্বরিক জগতে।
২. পতনের শুরু
২.১. আধুনিকতার পেছনে ধরা
১৪০০–১৫০০ এর দশকে রেনেসাঁ শুরু হলে, মুসলিম সমাজ তখন আর অন্তর্বর্তী পরিবর্তনের পথে উচ্চারিত ছিল না; রেনেসাঁতে পশ্চিম আধুনিকতা, গণতন্ত্র, শিল্প বিপ্লব ইত্যাদি যেমন অব্যাহত, মুসলিম সমাজ তখন বরাবর অতীত গৌরবেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ‘বৃষ্টিকার’ জানে না, বর্ষাকেও।
২.২. ধ্যানমগ্নতা থেকে ধ্যানহীনতা
ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যায় ‘তাৎপর্য’ গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু সেই তাৎপর্য বিস্মৃত হয়ে পড়ে। যেখানেই জ্ঞানচর্চা জাতীয় মূল্য পাওয়া না যায়, থাকা যায় না মূল আলো, অদ্ভুত বিশ্বাস বাস করে। জ্ঞানের বদলে বিদআতের তত্ত্ব পৃষ্ঠাগুলোতে এসে পড়ে।
২.৩. ভাঙা নেতৃত্ব: দারিদ্র্য বনাম বিত্ত
যেখানে এক সময় আমাদের নেতারা ছিল ন্যায়দমনমুক্ত, সর্বোচ্চ মূল্যবোধের প্রতিনিধি; আজ আমাদের অনেক রাজনীতিবিদ ‘স্বার্থ’ই মাথায় রাখেন। দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন আর অসুস্থতার মধ্যে ফেসবুক ছড়ানো কুরআনও ‘দাওয়ায় হাসিল’ মাত্র হয়ে তাদের জন্য।
৩. বিভাজনের বিস্তার
৩.১. মতপার্থক্য, নির্বোধভাবে বড়াবড় করা
শিয়া‑সুন্নি, মাযহাব, তাহক্কী, সুফি, আদ্দদিওয়ালা— এর মধ্যে মতভেদ আলোচনার মাধ্যমে বোঝা যায়। কিন্তু আমাদের সমাজে তা হয়েছে বিভাজনের ভিত্তি। মতপার্থক্য দেখতে পেলেই ‘কাফির’ বা ‘বেহুদে’ মারাত্মক শব্দগুলো স্রেফ ছুঁড়ে দেওয়া হয়।
৩.২. নারীর সম্ভাবনা: দূরত্ব বজায় থেকে বিস্মৃত হয়নি
ইসলামে নারীর গুরুত্ব ছিল—খাদিজা, আয়েশা, রুকিয়া, ফিরদৌসি পরিবারের নারীরা ধর্ম, ব্যবসা, বৈজ্ঞানিক চর্চার অগ্রদূত ছিলেন। কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজে নারীদের প্রান্তিকীকরণ থেকে পুরো জাতি পুরনো সীমাবদ্ধতায় আটকে পড়ে।
৪. বাইরের আগ্রাসন: দখল আর বিভক্তিকরণের ধ্বংসযজ্ঞ
৪.১. উপনিবেশের ঔপনিবেশিক দলিল
মুঘল, ব্রিটিশ, ফরাসি—তারা গিয়েও আমাদের ‘ভৌগোলিক’, ‘জাতিগত’, ‘নৈতিক’, ‘শারীরিক’, ‘আধ্যাত্মিক’ ভাবে শক্তি সমর্বা করে ফেলেছে। স্বাধীনতার একাত্তরে যুদ্ধ যতই হয়েছে, তারপর দেখা গেলো বীরত্বের জায়গায় আমাদের অযোগ্যতা।
৪.২. আধুনিক সাম্রাজ্যবাদীর হস্তক্ষেপ
মার্কিন হস্তক্ষেপ যেমন তেল, ধর্ম, রাজনৈতিক সংকট ও একাধিক কালীন সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে (ইরাক, সিরিয়া)। ফিলিস্তিনে দীর্ঘপ্রায় ৭০ বছর ধরে চলছে সর্বোচ্চ নির্যাতন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে – কোথায় আমাদের শক্তি? কোথায় আমাদের সম্মিলিত নড়াচড়া?
৫. বর্তমান অবস্থা ও প্রতিফলন
দারিদ্র্য: বিশ্বের ২০ পরিকল্পিত দরিদ্রতার তালিকায় ৬–৭টি মুসলিম দেশ।
সংকটে গণতন্ত্র: গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মিডিয়া স্বাধীনতা অনেক দেশে নিঃশ্রেণী।
অশিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভরতা: কম্পিউটার, অথর্ব্ ICT, Big Data ইংরেজি ছাড়া অনেক দেশে আলোচনা হয় না।
নারীবিদ্বেষ ও জঙ্গিবাদ: ইন্টারনেটে নারীবিদ্বেষ ভাইরাল, জঙ্গিবাদেও দেখা যায়—ধর্মকে নয়, দুনিয়াকে বোঝে না।
৬. উত্তরণের পথ
৬.১. ব্যক্তিগত ও সমাজিক জাগরণ
প্রথমে প্রয়োজন হৃদয়ের প্রশিক্ষণ। কুরআনের শেখার আগে তা প্রয়োগে মানসিক পরিবর্তন দরকার। যেন ‘এই পৃথিবী আমার বসবাস ও দায়িত্ব’ গ্রহণ করতে হয়।
৬.২. জ্ঞান‑বিজ্ঞানে বিনিয়োগ
বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, ছাত্র‑শিক্ষক উভয় পরে জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চাই। ১৯০৮ সালে তেল আবিষ্কারের মতো বছরে সারা বিশ্বকে তাকিয়ে পড়ার মতো মাধ্যаның প্রয়োজন।
৬.৩. সংস্কারধর্মী নেতৃত্ব
একজন রুমি, রদাউদিন আইয়ুবির মতো—অন্তর্দৃষ্টি ও ন্যায়বোধে পরিচালিত রাজনৈতিক, সামাজিক নেতাদের প্রয়োজন। আদর্শবান, ধর্মভিত্তিক নয়—ন্যায়, গবেষণা ও অন্তর্দৃষ্টিতে লীন।
৬.৪. নারীর ক্ষমতায়ন
নারীকে আধুনিক প্রযুক্তি‑শিক্ষায় এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। তারাই পারে দুনিয়া বদলাতে, শান্তির জাগরণে নেতৃত্ব দিতে। এটি ইসলামের নাম, না ধর্মের।
৬.৫. ঐক্য ও সহনশীলতা
এক‑মতের সত্ত্বেও আমরাও বিভাজিত হচ্ছি। ইখতিলাফ সুন্নত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা হয়েছে বিভাজনে রূপান্তর। মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, সমাজ গড়তে পারলে মুসলিম বিশ্ব সমৃদ্ধ হবেই।
উপসংহার
মুসলিম জাতির দুর্ভাগ্য নয়, বরং সুযোগ – কারণ আমরা এক সময় rest of world‑কে দেখিয়েছিলাম, আমরা ভিন্ন ছিলাম, আমরা জ্ঞান, ন্যায়, বিজ্ঞান ও মানবিকতার সম্মিলন ঘটিয়েছি। বর্তমানের দুর্দশা আমাদেরকে আর্থিকভাবে ম্লান করেছে, ইতিহাসের পাতায় রেখেছে এক শ্যোলোকেট।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত, আমরা জেগে উঠতে পারি। কাজ শুরু হলো আজ —
– জ্ঞানে বিপ্লব,
– নৈতিক নেতৃত্ব,
– নারীর ক্ষমতায়ন,
– ঐক্য ও সহযোগিতা,
– আত্মিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণ।কুরআন বলেছে:
“আল্লাহ তোমাদের অবস্থা কখনো পরিবর্তন করে না, যতক্ষণ না তোমরা নিজেরাই সক্রিয়ভাবে নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা না কর।” (সূরা রা’দ, ১৩:১১)
