• মানুষ জন্মায় শ্বাস নিতে, কিন্তু সে বাঁচে হিসাব করতে।

      তার প্রথম কান্না অব্যক্ত, কিন্তু পরের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো চাহিদা।
      জীবন ক্রমে পরিণত হয় এক দীর্ঘ হিসাবের খাতায়—যেখানে প্রতিটি হাসি, প্রতিটি ভালোবাসা, এমনকি প্রতিটি নিঃশ্বাসও টাকার মাপে পরিমাপিত হয়।
      এমন এক সময়ে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে আত্মার মূল্য কম, কিন্তু মুদ্রার বিনিময় হার প্রতিদিন বাড়ছে।

      টাকা—মানুষের সৃষ্টি, কিন্তু মানুষই এখন তার দাস।
      এই দাসত্ব এত সূক্ষ্ম, এত কোমল, এত সুশৃঙ্খল, যে আমরা তা টেরই পাই না।
      আমরা বিশ্বাস করি টাকা আমাদের স্বাধীনতা দেবে, অথচ ঠিক সেই বিশ্বাসই আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়।
      আমরা নিজেদের বিক্রি করি নিরাপত্তার বিনিময়ে, চাকরির নামে, মর্যাদার নামে, সামাজিক স্বীকৃতির নামে।
      আমাদের চোখে টাকা কেবল কাগজ নয়; সে হলো ক্ষমতার প্রতীক, অস্তিত্বের প্রমাণ, বেঁচে থাকার ছদ্মনাম।

      কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, টাকার চেয়ে বেশি কাল্পনিক কিছুই নেই।
      তার শক্তি আসে মানুষের বিশ্বাস থেকে।
      যদি সবাই একদিন সিদ্ধান্ত নেয়, “এই কাগজের কোনো মূল্য নেই”—তাহলে পুরো সভ্যতা ভেঙে পড়বে একদিনেই।
      অর্থাৎ, টাকার অস্তিত্ব একটি সম্মিলিত কল্পনা, এক সামাজিক স্বপ্ন, যেখানে প্রত্যেকে ঘুমাচ্ছে একসাথে, আর কেউ জেগে নেই।
      এটাই পরাবাস্তবতার চূড়ান্ত দৃশ্য—যেখানে মায়াই বাস্তব হয়ে ওঠে, আর বাস্তব হারিয়ে যায় মায়ার গভীরে।

      মানুষ একসময় তার আত্মাকে শোনার ক্ষমতা রাখত।
      সে জানত কোনটা প্রয়োজন, কোনটা অপ্রয়োজন; কোনটা জীবন, কোনটা প্রদর্শন।
      কিন্তু আজ আত্মা স্তব্ধ—তার জায়গা দখল করেছে “অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স” নামের কৃত্রিম হৃদস্পন্দন।
      আমরা এখন সুখের সংজ্ঞা শিখি বাজারদরের ওঠানামা দেখে।
      একজন মানুষ এখন আর মানুষের চোখে মানুষ নয়, সে এক সংখ্যায় পরিণত—আয়, ব্যয়, লাভ, ক্ষতি, এইসব অঙ্কের খোপে বন্দি এক জীবন্ত সমীকরণ।

      এইসবের মাঝে প্রশ্ন জাগে—
      মানুষ আসলে কী চায়?
      সে কি টাকাই চায়, নাকি সেই অনুভূতিটা, যেটা টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়—নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভালোবাসা, স্থিতি?
      অর্থাৎ, মানুষ টাকা নয়, তার মাধ্যমে “অস্তিত্বের স্বীকৃতি” চায়।
      কিন্তু যতই সে টাকার পেছনে ছুটে, ততই সে নিজের স্বীকৃতি হারায়।
      একদিন সে বুঝতে পারে, তার কাছে যা আছে তা সবই ভাড়াটে—বাড়ি, গাড়ি, সম্মান, এমনকি বন্ধুত্বও।
      শুধু আত্মাটা ভাঙা আয়নার মতো পড়ে থাকে—যেখানে প্রতিফলিত হয় অচেনা এক মুখ, যে আর মানুষ নয়, বরং মুদ্রার মুখপাত্র।

      এই মানবজীবনের ট্র্যাজেডি এত সূক্ষ্ম যে তা কেবল চোখে দেখা যায় না—
      এটি অনুভব করা যায় ঘুমের ভেতর, এক অদ্ভুত শূন্যতার মতো,
      যা মনে করিয়ে দেয়, হয়তো আমরা ভুল গ্রহে ভুল জীবন কাটাচ্ছি।
      আমরা সৃষ্টি করেছিলাম টাকাকে বাঁচার সুবিধার জন্য,
      কিন্তু এখন টাকা আমাদের অস্তিত্বের অর্থ নির্ধারণ করছে।
      আমরা ভালোবাসা দিয়েছি টাকায় মাপতে, মৃত্যু দিয়েছি বিমায় বাঁধতে,
      আর আত্মাকে বন্দি করেছি লেনদেনের কাঁচের পাত্রে।

      তবুও মানবজাতির ভেতরে এখনো একটি আলো জ্বলে—
      সেই আলো আত্মা থেকে আসে, যেখানে কোনো মুদ্রা কাজ করে না।
      যেখানে একজন ভিখারি ধনী হতে পারে, কারণ সে এখনো হাসতে জানে,
      আর একজন ধনী দেউলিয়া, কারণ সে ভালোবাসার দাম ভুলে গেছে।
      এই পার্থক্যটাই দর্শনের পরম সত্য—
      টাকা জীবনের উপাদান হতে পারে, কিন্তু কখনো তার অর্থ হতে পারে না।

      মানুষ যখন তার অন্তরকে টাকার ঊর্ধ্বে দেখতে শিখবে,
      যখন সে বুঝবে, প্রয়োজন আর লোভের সীমারেখা কোথায়,
      যখন সে জানবে যে প্রতিটি জীবের মধ্যে একই সত্তা প্রবাহিত—
      তখনই হয়তো পৃথিবী আবার মানবিক হবে।
      সেই পৃথিবীতে হয়তো ব্যাংকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বিনিময়ের হাসি,
      লেনদেনের চেয়ে মূল্যবান হবে দয়া,
      আর মুদ্রার চেয়ে স্থায়ী হবে মানুষের ছোঁয়া।

      জীবনের প্রকৃত দর্শন এই—
      অস্তিত্বের মূল্য টাকা নয়, বরং অনুভূতি।
      টাকা আমাদের হাতে থাকতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে থাকা উচিত করুণা।
      যে দিন মানুষ এই পার্থক্যটি বুঝবে,
      সেই দিন হয়তো পৃথিবী সত্যিকার অর্থেই সভ্য হবে।

      আর তখন টাকার প্রতীক মুছে যাবে না, কিন্তু তার অর্থ বদলে যাবে—
      সে আর দাসত্বের নয়, হবে সেবার;
      সে আর অহংকারের নয়, হবে সহযোগিতার।
      তখন আমরা দেখব, পরাবাস্তবেরও ওপারে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে—
      তার নাম মানুষত্বচ

      pothiktv and Liton Hossain Jihad
      0 Comments