-
মেঘলা আকাশ তার নীরব চাদর মেলে বসে আছে—অপেক্ষার মতো দীর্ঘ, অনুচ্চারিত কষ্টের মতো ভারী। বসন্তের বাতাসও আজ আর কিশোরী নয়; তার হাসিতে নেই সেই উচ্ছ্বাস, বরং আছে এক অদৃশ্য শোকের সুর। নদী দুলে ওঠে, কিন্তু তার ঢেউয়ের ভাঁজে জমে আছে না বলা কত কথা—আমাদের অসমাপ্ত আলাপের প্রতিধ্বনি। আর আমি, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, হঠাৎ টের পাই—এই উষ্ণতা আর হৃদয়ে পৌঁছায় না; কারণ তোমার এলোমেলো চুলে আঙুল ছোঁয়ানোর সেই শিহরণ আজ বহুদিনের অনুপস্থিত।
কতো দিন হলো, শাড়ির নরম ভাঁজে তোমার সেই লাজুক হাসি আমাকে পাগল করে না। একসময় তোমার উপস্থিতি ছিল ঋতুর মতো—অপরিহার্য, অবধারিত। আজ সেই ঋতু হারিয়ে গেছে সময়ের অন্ধকার গহ্বরে, আর আমি ঋতুহীন এক প্রান্তরে দাঁড়িয়ে —শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস মাপি।
আকাবাকা গ্রামের পথগুলো আজও রয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের পায়ের ছাপগুলো মুছে গেছে কালের ধুলোয়। যে পথে আমরা হেঁটেছিলাম স্বপ্নের হাত ধরে, আজ সে পথ নিঃসঙ্গতার সাক্ষী। পাখিরা এখনো আকাশে উড়ে যায়, কিন্তু তাদের ডানায় আর আমাদের কোনো গল্প নেই। দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা একসময় আমাদের চোখে জ্বলত, তা আজ নিভে গেছে—নক্ষত্রহীন এক রাত্রির মতো।
আজ কতো দিন হলো, তুমি জানতে চাওনি—আমি কেমন আছি? আমার ভাঙা বুকের গভীরে যে কান্না জমে আছে, তা কি এখনো শব্দ হয়ে বেরোয়, নাকি নীরবতার কবরেই চাপা পড়ে থাকে? আমি কি এখনো রাত জেগে থাকি, নাকি ক্লান্তির কাছে হেরে গিয়ে অন্ধকারেই ডুবে যাই—তুমি আর জানতে চাও না। অথচ একসময়, আমার এক ফোঁটা অশ্রুও তোমার পৃথিবী কাঁপিয়ে দিত।
কতো দিন হলো, আমাদের দেখা হয়নি। সময় যেন ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে—দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা নদীর মতো, যারা শুধু একে অপরকে দেখে, ছুঁতে পারে না।
তবুও, এই আফসোসের গভীরতায় এক অদ্ভুত শান্তি লুকিয়ে আছে। কারণ তুমি ছিলে—এই সত্যটাই আমার অস্তিত্বকে এখনো আলোকিত করে। তোমার অনুপস্থিতিও এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে গেছে, যা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—আমি একসময় ভালোবেসেছিলাম, হৃদয়ের সমস্ত রক্তিমতা দিয়ে।
আর সেই ভালোবাসার রেশেই আজও আমি বেঁচে আছি—একটি দীর্ঘ অপেক্ষার ভেতর, যেখানে প্রতিটি ভোর আসে তোমার স্মৃতির আলো নিয়ে, আর প্রতিটি রাত নামে তোমার অনুপস্থিতির অন্ধকারে।
লেখা: লিটন হোসাইন জিহাদ (দাদাভাই)
