ওয়েব ৩.০ : বাংলাদেশের অনলাইন ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন দিগন্ত
লিটন হোসাইন জিহাদ: ইন্টারনেটে এক সময় মানুষ পড়ার জন্য তথ্য খুজতো। পরে সবাই লেখা ও মত প্রকাশের সুযোগ পায়, ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়। এখন যে নতুন ধাপের কথা বলা হচ্ছে, তাকে ওয়েব ৩.০ বলা হয়। এটি এমন এক ইন্টারনেট যেখানে ব্যবহারকারী শুধু পাঠক বা লেখক নয়, নিজের তথ্যের প্রকৃত মালিকও হয়ে ওঠবে। ওয়েব ৩.০ তে তথ্য আর কোনো একক কোম্পানির সার্ভারে থাকবে না। বরং ব্লকচেইন নামের প্রযুক্তিতে হাজার হাজার কম্পিউটারে ছড়িয়ে থাকবে। ব্লকচেইনকে কল্পনা করুন বড় একটি খাতার মতো যেখানে সবার লেনদেন বা তথ্য একবার লিখলে মুছে ফেলা বা বদলানো যাবে না, আর সেই খাতার কপি অনেকের হাতে থাকবে। ফলে কারও পক্ষে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির জন্য এই নতুন ধাপের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করছে, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করছে এবং ফ্রিল্যান্স কাজ করছে। কিন্তু এই সব কার্যক্রমের কেন্দ্রে থাকে কিছু বড় কোম্পানি। তারা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করে, বিজ্ঞাপন বিক্রি করে এবং মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে। ওয়েব ৩.০ এই পরিস্থিতি বদলে দেয়। এখানে তথ্য এক জায়গায় জমা থাকে না, বরং ব্লকচেইন নামের প্রযুক্তিতে অনেকগুলো কম্পিউটারে ছড়িয়ে থাকে। এতে করে কোনো একক প্রতিষ্ঠান তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
ব্লকচেইনকে অনেকটা পাবলিক খাতার মতো ভাবা যায়। ধরুন, গ্রামে ধান বিক্রির জন্য একটি খাতা আছে যেখানে সবার লেনদেন সবার সামনে লেখা হচ্ছে। কেউ চাইলে সেই খাতার কোনো পাতা বদলে দিতে পারবে না, কারণ সব পৃষ্ঠার নকল অনেকের হাতে রয়েছে। ওয়েব ৩.০ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। ফলে লেনদেনের তথ্য স্বচ্ছ ও নিরাপদ থাকে।
ধান বা সবজি বিদেশে রপ্তানির সময় অনেক সময় গুণগত মান বা উৎস নিয়ে সন্দেহ থাকে। ব্লকচেইনভিত্তিক নথিতে প্রতিটি ধাপের তথ্য লেখা থাকবে—কোন মাঠ থেকে ধান এসেছে, কখন সংরক্ষণ করা হয়েছে, কোন পথে রপ্তানি হয়েছে। এতে বিদেশি ক্রেতা সহজে যাচাই করতে পারবে এবং কৃষকও ন্যায্য দাম পাবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা পরিবারে টাকা পাঠাতে ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জের উপর নির্ভর করেন। এতে খরচ বেশি হয় এবং সময় লাগে। ব্লকচেইনের মাধ্যমে তৈরি করা নতুন আর্থিক সেবাগুলো অনেক কম খরচে ও দ্রুত এই টাকা পৌঁছে দিতে পারে।
অনেক সময় চাকরির জন্য জমা দেওয়া সার্টিফিকেটের সত্যতা যাচাই করতে সময় লাগে। যদি সব সার্টিফিকেট ব্লকচেইনে সংরক্ষণ করা হয় তবে নিয়োগকর্তা সহজে সঠিকতা যাচাই করতে পারবে এবং জাল সনদ ব্যবহার করা কঠিন হবে।
ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইনে কাজের বাজারে যারা আছেন, তারা বিকেন্দ্রীকৃত অ্যাপ তৈরি করে বা ডিজিটাল পণ্য বিক্রি করে আয় করতে পারবেন। যেমন একজন শিল্পী নিজের আঁকা ছবির ডিজিটাল সংস্করণ ওয়েব ৩.০ মার্কেটপ্লেসে বিক্রি করতে পারে এবং বিক্রির পরও মালিকানা সংরক্ষণ করতে পারে।
বাংলাদেশে এখনো ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ নয়। ব্লকচেইনভিত্তিক অনেক সেবার জন্য এই মুদ্রার প্রয়োজন হতে পারে। তাই সঠিক আইন ও নীতিমালা তৈরি করা দরকার।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই ধরনের নতুন অ্যাপ তৈরি ও পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ লোকের প্রয়োজন, যা এখনো কম।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও আছে। গ্রামে বা প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেটের গতি সব সময় স্থির নয়, অথচ ওয়েব ৩.০ তে দ্রুত ও স্থিতিশীল সংযোগ দরকার।
প্রথমে সরকারি পর্যায়ে এই প্রযুক্তিকে বোঝার জন্য গবেষণা ও পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করা উচিত। যেমন কৃষিপণ্যের রপ্তানি বা সরকারি নথি সংরক্ষণে ব্লকচেইন ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ব্লকচেইন ও ওয়েব ৩.০ নিয়ে কোর্স চালু করতে হবে, যাতে তরুণরা এই নতুন দক্ষতা শিখতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সচেতনতা। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে ওয়েব ৩.০ কেবল জটিল প্রযুক্তি নয়, বরং তাদের নিজের তথ্য ও লেনদেনের নিরাপত্তা বাড়ানোর একটি উপায়।
ওয়েব ৩.০ বাংলাদেশে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। কৃষক থেকে শুরু করে প্রবাসী শ্রমিক, তরুণ উদ্যোক্তা থেকে শিল্পী—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন শক্ত নীতিমালা, দক্ষ জনবল এবং সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি। সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে বাংলাদেশ এই নতুন ইন্টারনেট যুগের সুবিধা গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারবে।

Responses