আমি মানুষ, কারণ আমি ভালোবাসি: লিটন হোসাইন জিহাদ

ঘুম ভাঙে না কারো। সকালের আলোয় যে আলো নেই, তার নাম সকাল নয়। মানুষের চোখ খোলে, কিন্তু চেতনা নিদ্রিত।
বিশ্ব যেন এক বিস্মৃত স্বপ্ন। প্রতিটি মানুষ এক একখণ্ড ভাসমান ছায়া, ছায়ার নিচে আবার ছায়া। মুখে মুখোশ, হাসিতে কৃত্রিম রঙ, চোখে পলিথিনের অন্ধকার। এমন এক সময়ে, যখন আকাশে রংধনু নেই, নদীর স্রোতে শব্দ নেই, প্রেমে উৎসার নেই—তখন হঠাৎ কোনো এক নিস্তব্ধ বিকেলে, এক পলক আলো এসে দাঁড়ায় মনের কপাটে।
এ আলো চোখের আলো নয়, হৃদয়ের মণিকোঠায় এক স্ফুলিঙ্গ। একে বলে তৃতীয় নয়ন। অদৃশ্য এক জানালা, যা দিয়ে দেখা যায় অদেখা দৃশ্যপট। যেখানে ফুল কথা বলে, পাখি গান গায় না, বরং প্রশ্ন তোলে। গাছ হাঁটে, নক্ষত্র ভিজে যায় জলকণিকায়।
এই তৃতীয় নয়ন জন্ম নেয় না হঠাৎ, যেমন জন্ম নেয় না সত্য কিংবা প্রেম। সে তো জেগে ওঠে ধ্বংসের গর্ভে, আঘাতের শিখরে, আত্মার অভ্যন্তরে এক দীর্ঘ বিস্মরণ শেষে। এই নয়ন খুললে দেখা যায়—
নদীর কুলে এক বালক বসে, তার শরীর জলের, চুল ঘাসের, চোখ আগুনের। সে তাকিয়ে থাকে সমাজ নামক কংক্রিটে বাঁধানো জেলখানার দিকে, যেন বলতে চায়—
“মানুষ হও, মানুষ হও!”
মানুষ এখন বিজ্ঞানের বন্দি, যন্ত্রের মায়ায় বন্দী প্রেম। আমরা যান্ত্রিক হাসিতে আবৃত, অথচ অন্তরে ফাঁপা বেলুনের মতো। প্রেম সেখানে ছেঁড়া কাগজের মতো উড়ে বেড়ায়।
কী আশ্চর্য! আমরা প্রেমের কথা বলি, অথচ ভালোবাসার ভাষা ভুলে গেছি। আমাদের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস, করতলে স্বার্থ, কণ্ঠে প্রতারণার গান।
তৃতীয় নয়নের আলোয় দেখা যায়, এক আকাশ যেখানে গ্রহেরা কাঁদছে। মানুষের অবিশ্বাস, হিংসা ও লোভে কাঁপছে এই নীল গ্রহ। সেখানে প্রেম মৃত, করুণায় কাঙাল।
তবে শেষ হয়নি সব, কারণ বালকের চোখে এখনো জ্বলছে আগুন।
সময়ের শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে, দাগ পড়ছে মুহূর্তে মুহূর্তে। পাথরের শহরে পাথরের মানুষ গড়ে উঠছে।
কিন্তু কে যেন, এক অদৃশ্য কারিগর, তুলিতে রঙ মেখে এঁকে চলেছে ভিন্ন এক দৃশ্যপট। সেখানে মানুষ অদ্ভুত রকম স্বচ্ছ, যেমন নদীর জল, যেমন শিশুর হাসি।
তৃতীয় নয়ন খুললে দেখা যায়, এই মানুষরূপী রক্তমাংসের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসছে এক আলোমানব। সে হেঁটে চলে শব্দহীন ভাষায়, তার শরীরে ছুঁয়ে যায় প্রেমের রেণু।
সে জানে না রাষ্ট্র কী, ধর্ম কী, জাত কী। সে জানে শুধু মন, ভালোবাসা, কান্না, ছোঁয়া, বৃষ্টি, হাসি, দুঃখ।
তার জন্য মানবতা কোনো তত্ত্ব নয়, বরং প্রতিদিনকার রুটির মতো প্রয়োজন।
প্রেম—এখন আর শুধু হৃদয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রেম এখন বাতাসে, ঘুমে, মৃত মানুষের স্বপ্নে, নিঃশব্দ শব্দে।
তৃতীয় নয়ন খোলে দিলে বোঝা যায়, প্রেম আসলে এক সত্তা—যে জন্ম নেয় দুঃখে, বেড়ে ওঠে আত্মত্যাগে, এবং প্রস্ফুটিত হয় নিঃস্বার্থতায়।
মানব প্রেম এক পরাবাস্তবতা, কারণ এ প্রেম বেছে নেয় না, প্রশ্ন তোলে না, দাবি করে না।
এই প্রেম এক গন্ধহীন ফুল, যার সৌরভ চেতনায়। এক সুরহীন সঙ্গীত, যা বাজে হৃদয়ের গহিনে।
তৃতীয় নয়নের আলোয় দেখা যায়, প্রেম আসলে এক আয়না—যেখানে প্রতিফলিত হয় নিজেকে ভালোবাসার স্পৃহা।
এই প্রেমে নেই সংকোচ, নেই শর্ত। শুধু একটি কথা থাকে—“তুমি আছো, তাই আমি আছি।”
যেখানে বোমা বিস্ফোরিত হয় না, সেখানে কবিতা জন্মায়। যেখানে বিদ্বেষ নেই, সেখানে শিশুরা খেলে রঙের দেশে।
যে সমাজ তৃতীয় নয়নে পৃথিবী দেখে, সে আর যুদ্ধ চায় না, সে চায় আলো, জল, গান ও গাছ।
এই সভ্যতার নাম—মানব সভ্যতা।
যেখানে মানুষ আর কেবল মানুষ নয়—সে এক কবিতা, এক বৃক্ষ, এক মেঘ, এক নদী, এক স্বপ্ন।
মানুষ সেখানে ঝড়ের দিনে আশ্রয়, শীতের রাতে আগুন, অন্ধকারে প্রদীপ।
মানুষ সেখানে আরেক মানুষের চোখে ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি।
এই পরাবাস্তব পৃথিবী আমাদের চেনা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি সত্য।
কারণ এখানে সময় দাঁড়িয়ে থাকে, ফুল কথা বলে, নদী হাসে, অশ্রু গান গায়।
এই সত্য কেউ মানে না, কারণ আমাদের চোখ এখনো বন্ধ। কিন্তু যে খুলে দেখেছে, তার আর ফিরে যাওয়া নেই।
তৃতীয় নয়ন একবার খুললে, জগৎ পালটে যায়।
মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে। আর মানুষ হলে তবেই প্রেম সম্ভব।
প্রেম জাগলে, ঘৃণা নিঃশেষ হয়।
আর তখনই হয়তো সত্যি সত্যি বলা যাবে—
“আমি মানুষ, কারণ আমি ভালোবাসি।”
চোখের আলো দিয়ে নয়, হৃদয়ের আলো দিয়ে দেখো। তোমার তৃতীয় নয়ন খুলুক—আর তুমি হয়ে উঠো সেই মানুষ, যার জন্য পৃথিবী এখনো অপেক্ষা করে।

Responses