বেনামাজিদের হত্যা নিয়ে বিতর্ক: মোজাফফর বিন মহসিন–এর বক্তব্যে তীব্র সমালোচনা

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামী বক্তা মোজাফফর বিন মহসিন–এর একটি বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একটি ভিডিওতে তিনি বেনামাজিদের “মুরতাদ” আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা করার কথা বলেন, যা দ্রুতই জনমনে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

কী বলা হয়েছিল ভিডিওতে

গত ১ মে তার ভেরিফায়েড পেজে প্রকাশিত প্রায় ১২ মিনিটের ওই ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, যারা নামাজ পড়েন না তাদের হত্যা করা উচিত এবং এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে নাকি কোনো মতভেদ নেই। একইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বেনামাজিদের জানাজা পড়া যাবে না, এমনকি তারা আত্মীয়স্বজন হলেও তাদের স্পর্শ করা হারাম।

এ ধরনের বক্তব্যে তিনি মৃত ব্যক্তির দাফন নিয়েও অবমাননাকর তুলনা করেন, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এর বিরোধিতা করেন। অনেকেই মন্তব্য করেন, এ ধরনের উগ্র বক্তব্য ইসলাম ধর্মের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের বক্তব্যের জন্য কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

আলেমদের প্রতিক্রিয়া

দেশের বিভিন্ন আলেম এই বক্তব্যকে স্পষ্টভাবে ভুল, ভিত্তিহীন এবং আপত্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন।

আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, “নামাজ না পড়লে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না। কাউকে মুরতাদ বলার জন্য স্পষ্টভাবে ইসলাম অস্বীকার করতে হয়। তাই এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।”

জনপ্রিয় বক্তা মুফতি রেজাউল করিম আবরার মন্তব্য করেন, “এই বক্তব্য শতভাগ ভুল। ইসলামে কোথাও বলা হয়নি যে নামাজ না পড়লে তাকে হত্যা করতে হবে। এটি চরম বিভ্রান্তিকর এবং খারেজি চিন্তাধারার প্রতিফলন।”

অন্যদিকে ড. আব্দুল্লাহ আল-মারুফ বলেন, “বেনামাজী গোনাহগার হতে পারে, কিন্তু তাকে কাফের বা মুরতাদ বলা সঠিক নয়। বরং এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ফতোয়া সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে।”

অতীত বিতর্ক

এটাই প্রথম নয়—এর আগেও মোজাফফর বিন মহসিন বিভিন্ন সময় বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে ইসলামী বক্তা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের সময়ও তাকে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

পরে তদন্তে উঠে আসে, ওই হত্যাকাণ্ডটি মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের জেরে সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)–এর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।

ধর্মীয় বিষয়ে দায়িত্বশীল বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে এমন সমাজে যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি গভীরভাবে প্রোথিত। আলেমদের মতে, কোনো ব্যক্তি নামাজ না পড়লে তা অবশ্যই গোনাহের বিষয়, কিন্তু তাকে হত্যা করা বা সামাজিকভাবে বর্জন করার মতো চরম সিদ্ধান্ত ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—ধর্মীয় বক্তব্যের নামে উসকানিমূলক বা সহিংসতার ইঙ্গিতবাহী বক্তব্যের বিরুদ্ধে কী ধরনের সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সুত্র: দি ডিসেন্ট

Related Articles

পুর্নজন্ম কি বৈজ্ঞানিক ভাবে সম্ভব? — একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ

মানব ইতিহাস জুড়ে মানুষের মৃত্যু ও মৃত্যুর পর কী হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বহু ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা চেষ্টা করেছে। অতীতে জীবনের পরের ধাপে…

হাইনান এক্সপো ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের প্রবেশদ্বার

ষষ্ঠ চীন আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্য মেলা (হাইনান এক্সপো ২০২৬) আমি মোঃ জাহিদ হাসান নিরব চীন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সানিয়া ইনস্টিটিউটের) এমবিএ  ছাত্র হওয়ার সুবাদে সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ…

জুলাই বিপ্লবের সাদিম কায়েম এর যে কাহিনী সবার জানা প্রয়োজন

জুলাই বিপ্লব নিয়ে ইয়েনি সাফাককে (তুরস্কের গণমাধ্যম) একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জুলাই বিপ্লবের নেতা সাদিক কায়েম। তিনি ব্যাখ্যা করছেন, কীভাবে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে…

শ্রমিক দিবস: অধিকার ও বাস্তবতার মুখোমুখি

লিটন হোসাইন জিহাদ: আজ  International Workers’ Day—শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। উনিশ শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী বিশ্বে শ্রমের শোষণ যখন চরমে পৌঁছায়, তখনই শ্রমঘণ্টা…

দাম্পত্য জীবনে সুখের চাবিকাঠি: শরীর নয়, বোঝাপড়া ও সম্মানই আসল স্পর্শ

দাম্পত্য জীবনে সুখ কেবল শারীরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। বরং এটি গড়ে ওঠে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, মানসিক সংযোগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি শক্ত ভিত্তির ওপর।…

Responses