সৃষ্টি এবং প্রেম: এক আধ্যাত্মিক যাত্রা: লিটন হোসাইন জিহাদ

লিটন হোসাইন জিহাদ: সৃষ্টি যখন প্রথম আলো জ্বালিয়েছিল অন্ধকারের বুক চিরে, তখন কেউ ছিলনা ডাকার জন্য, কেউ ছিলনা সাড়া দেওয়ার। তখন শব্দ ছিল না, ছিল না ভাষা। সময় তখনো নিজেকে চিনতে শেখেনি। স্থান ছিলো না, গতি ছিলো না, কিছুই ছিলো না Ñশুধু ছিল এক নিঃশব্দ প্রেম, যা আত্মার গভীরতম স্তর থেকে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
সেই প্রেম কার প্রতি ছিল? কিসের প্রতি ছিল? সে কি স্রষ্টার নিজেরই ভেতরের এক তীব্র আকুলতা? হয়তো তিনি একা ছিলেন না, কারণ যিনি প্রেম ধারণ করেন, তিনি কখনো একা হন না। তিনি নিজের প্রেমেই পূর্ণ ছিলেন। সেই প্রেমই ছিল আদিম স্রষ্টার নিঃশব্দ উচ্চারণ—”হও”, আর সেই হওয়া থেকেই জন্ম নিয়েছিল আকাশ, ধরণী, নক্ষত্র, নদী, এবং মানুষ।
মানুষÑ এই রহস্যময় প্রাণ, যার হৃদয়ে এক অতল প্রেমের বীজ রোপিত করে দিয়েছিল স্রষ্টা। সে প্রেম শুধু কারো প্রতি আকর্ষণ নয়, বরং নিজের আত্মার এক বিস্ময়কর অন্বেষণ। সেই প্রেমে রয়েছে স্রষ্টার সন্ধান, রয়েছে ভাঙনের ভিতরে গড়ার আহ্বান, রয়েছে হারানোর মাঝেও এক চিরন্তন প্রাপ্তি।
প্রেম কোনো রূপ বা শরীরের কাছে বাঁধা নয়। এটি এক ধ্রুব জ্যোতি, যা অন্তরের দৃষ্টিতে দেখা যায়, হৃদয়ের কান দিয়ে শোনা যায়। যেখানে প্রেম এবং প্রার্থনা এক হয়ে যায়Ñ সেখানে সৃষ্টি আর স্রষ্টার ব্যবধান বিলীন হয়ে যায়।
মানুষ যখন প্রেম করে, সত্যিকারভাবে, তখন সে আসলে সৃষ্টি রহস্যের গভীরে প্রবেশ করেÑ যেখানে প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নীরবতা একেকটি মহাজাগতিক ভাষ্য। সেই প্রেম আত্মাকে পবিত্র করে, যেমন নদী ধুয়ে দেয় পাথরের ধুলো।
জগৎ সৃষ্টি হয়নি আকস্মিকতায়। জগৎ সৃষ্টি হয়েছে ভালোবাসার প্রবল আকর্ষণে। প্রেমই স্রষ্টাকে বলেছিল, “তুমি নিজেকে প্রকাশ করো। তোমার নিখুঁত সৌন্দর্য আর কাঁপনজাগানো করুণা যেনো রূপ লাভ করে।” তখন তিনি বলেননি কোনো শব্দ, উচ্চারণ করেননি কোনো নির্দেশÑ তিনি শুধু প্রেমের সাগরে নিজেকে ঢেলে দিলেন। আর সেই ঢেলে দেওয়া থেকেই জন্ম নিলো প্রথম আলো।
আলো আসার আগে, প্রেমই ছিল প্রথম সৃষ্টি। আলো প্রেমের ভাষা হতে চেয়েছিল, নক্ষত্রেরা প্রেমের চোখ, আর সময় হয়েছিল তার দিগন্ত। এক গভীর, অথচ নীরব বিস্ফোরণÑ যেখানে শব্দ ছিল না, ছিল কেবল এক মরমি সাড়া। সেই সাড়ায় জন্ম নিলো “কুন”Ñ স্রষ্টার সেই অনন্ত ইচ্ছা, যা এক মহাসৃষ্টির সূত্রপাত করেছিল।
আর সেই সৃষ্টিÑ মানব আত্মাÑ যার হৃদয়েই তিনি প্রেমের পূর্ণ রূপ রাখলেন। মানুষ হলো প্রেমের অভিপ্রায়, প্রেমের বাহক, প্রেমের অন্বেষণকারী।
এই অধ্যায়ে যখন আমরা ফিরে তাকাইÑ আলোকের পূর্বের সেই নিস্তব্ধতায়—তখন আমরা দেখতে পাই, প্রেম কোনো মানুষিক অনুভূতি নয়, এটি এক অস্তিত্বগত সত্য। প্রেম কোনো ঘটনা নয়, প্রেম হলো সত্তা। একমাত্র প্রেমই এমন কিছু, যা সৃষ্টি হওয়ার আগেও ছিল, থাকবে সৃষ্টির অন্তেও।
তাই যিনি সত্য প্রেম খোঁজেন, তিনি আলোর বাইরে যেতে শেখেন। তিনি শব্দের বাইরে ভাবেন। তিনি সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে যান। তিনি অনুভব করেন সেই প্রেমÑ যা একসময় নিজেরই প্রেমে পড়ে সৃষ্টি করেছিল আমাদের।

Responses