আমেরিকায় ইসলামফোবিয়া ও মুসলিমদের রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা: ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামফোবিয়া রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও মুসলিম আমেরিকানরা নাগরিক অধিকার ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

ইসলাম ডেস্ক: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:০৪ পূর্বাহ্ন
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম আমেরিকানরা একটি জটিল ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে জীবনযাপন করতে শিখেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে অন্য আমেরিকানদের ভয় এবং অজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে হয়েছে এই সম্প্রদায়কে। হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তীব্র সহিংসতার ঢেউ দেখা যায়, যেখানে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান এবং কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম অভিবাসীদের লক্ষ্য করে বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
সেই সময় মার্কিন জনগণের মধ্যে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা দূর করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। ২০০৬ সালের এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা জানতেন যে মুসলিমরা খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মতোই একই ঈশ্বরের উপাসনা করেন। এমনকি প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করতেন যে মুসলিমরা চন্দ্র দেবতার পূজা করেন। এই ভয় ও অজ্ঞতা গত এক চতুর্থাংশ শতাব্দী জুড়ে মার্কিন সমাজে নানাভাবে বজায় রয়েছে।
গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনাগুলো কেবল বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটে না। নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশন ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচন সামনে এলেই মূলত ইসলামফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনী প্রচারণায় নেতাদের বক্তব্য এবং জাতীয় সংকটের ভাষা মার্কিন জনগণের মানসিকতা গঠনে বড় প্রভাব ফেলে।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির অনেক রাজনীতিকের কণ্ঠে চরম মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। ডানপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট লরা লুমার মুসলিমদের সরকারি পদে আসীন হওয়া নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ন্যান্সি মেস এবং র্যান্ডি ফাইনও একই ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। এছাড়া টেক্সাস এবং মিশিগানের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে মুসলিম রাজনীতিবিদ ও সংগঠনগুলোকে লক্ষ্য করে মিথ্যা অভিযোগ ও কঠোর আইন তৈরির চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট দেশটির অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থা ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস’ (কেয়ার)-কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, মুসলিমদের অধিকার হরণের জন্য গৃহীত এসব ব্যবস্থা কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো দেশের গণতন্ত্র ও সার্বিক নাগরিক স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করে।
এতসব বাধা সত্ত্বেও মুসলিম আমেরিকানরা রাজনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও সংগঠিত হয়েছেন। একটি সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রেকর্ড ২৫৫ জন মুসলিম নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ১১ জন মেয়র, ১৮ জন বিচারক এবং মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ৪ জন সদস্য রয়েছেন। নির্বাচিত এই মুসলিম প্রতিনিধিদের মধ্যে ৪৩ শতাংশেরই বেশি নারী।
জোহরান মামদানী এবং আবদুল এল-সায়ৈদের মতো উদীয়মান মুসলিম নেতারা সর্বজনীন জনকল্যাণমূলক নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন পানি, শিশুদের যত্ন এবং সবার জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে তাঁদের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইসলামফোবিয়া ছড়ানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হলেও মুসলিম আমেরিকানরা সবার অধিকার রক্ষা এবং সার্বিক সমাজ উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র: The Guardian – Islam





