কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রগতি ঠেকাতে তৎপর সিলিকন ভ্যালি, মার্কিন নীতির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে এবং চীনকে পেছনে ফেলতে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ওপর বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে চীনের অগ্রগতি নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেইসহ সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী নেতারা আশঙ্কা করছেন, অতি-উন্নত বা সুপার-ইন্টেলিজেন্ট এআই তৈরিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেলে তা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এই আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে।
চলতি সপ্তাহে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল—সাইবার নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং মানবজাতির ভবিষ্যতের স্বার্থে এআই উন্নয়ন ধীরগতির করার আহ্বান তিনি সমর্থন করেন কি না। জবাবে ট্রাম্প না সূচক উত্তর দেন এবং যুক্তি হিসেবে চীনের নাম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এআই প্রযুক্তিতে চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং দেশের এই শীর্ষস্থান তিনি ধরে রাখতে চান। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আসলে এআই খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি।
অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তি দিয়ে আসছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে এক তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা মার্কিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেই এআই খাতের ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর গতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানালেও স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ততটুকুই ধীরগতি অবলম্বন করতে পারে যতটুকু করলে চীন তাদের ধরে ফেলতে পারবে না। আমোদেই সতর্ক করে বলেন, চীন নীতি ভঙ্গ করলে তারা এমন শক্তিশালী এআই পেয়ে যাবে যা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করবে।
সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি খাত নিজেদের চীনের বিরুদ্ধে একটি নতুন ‘স্নাযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার’-এর অগ্রগামী দল হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের মতে, মার্কিন আধিপত্য ও গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে আমেরিকার এআই সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। এই ভাবনায় এআই নিরাপত্তা গবেষক, প্রযুক্তি-সামরিক জোরদারকারী এবং নব্য-সংরক্ষণশীলরা এক ছাতার নিচে এসেছেন। সরকারি কৌশল তৈরি ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের জন্য এআই কোম্পানিগুলো বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে নিজস্ব নীতি নির্ধারণী দল গঠন করেছে।
অ্যানথ্রোপিকের ডারিও আমোদেই চীন থেকে আসা এআই হুমকির বিষয়ে অত্যন্ত সোচ্চার। তিনি মনে করেন, অতি-উন্নত এআই প্রযুক্তি যেন কোনো দমনপীড়নকারী শাসনব্যবস্থার হাতে না পড়ে তা নিশ্চিত করাই তাঁর মূল লক্ষ্য। তবে অন্য প্রযুক্তি নেতাদের চেয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান বা মেটার মার্ক জাকারবার্গ প্রতিযোগিতাকে করপোরেট ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। অন্যদিকে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং চীনা এআই মডেল ব্যবহারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো কাইল চ্যান জানান, আমোদেই মূলত কর্তৃত্ববাদী এআই বনাম গণতান্ত্রিক এআইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আমোদেই একাধিক প্রবন্ধে লিখেছেন, চীনের কাছে অতি-ক্ষমতাধর এআই পৌঁছানো মানবজাতির জন্য অন্যতম বড় বিপদ। তাঁর মতে, এআই চালিত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র লাখ লাখ স্বয়ংক্রিয় ড্রোন স্কোয়াড তৈরি করতে পারে, যা যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করতে এবং নাগরিকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতে সক্ষম। চীনের এই উন্নয়ন ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে এআই চিপ এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সরঞ্জাম চীনে রপ্তানি বন্ধের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি, যদিও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এসব রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাকে ব্যর্থ বলে অভিহিত করেছেন।
নিজের অবস্থান শক্ত করতে আমোদেই জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি বাইডেন প্রশাসনের সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল কর্মকর্তা তরুণ ছাবড়াকে অ্যানথ্রোপিকের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রধান হিসেবে যুক্ত করেছেন। ছাবড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এআই অগ্রগতি রুখতে মার্কিন সরকারের পূর্ণমাত্রার পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া আমোদেই সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের চীন নীতির রূপকার ম্যাট পটিনজারের সঙ্গে যৌথ নিবন্ধ লিখে চিপ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এআই সম্পর্কিত আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, বেইজিং এআই সুরক্ষার বিষয়টিকে আমেরিকান চক্রান্ত হিসেবে দেখছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের ডিজিটাল ফরেনসিক রিসার্চ ল্যাবের সিনিয়র ফেলো কেনটন থিবো বলেন, বেইজিং মনে করে নিরাপত্তার বাহানায় চীনকে থামিয়ে রাখার চক্রান্ত চলছে। মার্কিন রাজনীতিবিদরা অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন চাপ ও আসন্ন নির্বাচনের কারণে এআই নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকতে পারেন, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা সাইবার হামলার মতো ঝুঁকি এড়াতে উভয় দেশের জন্যই সমঝোতায় আসা প্রয়োজন।
