ছবিতে মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা অবোধ শিশুটিকে দেখতে পাচ্ছেন—তার নাম ছিল আলী। গতকাল এই নিষ্ঠুর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া ‘আবদুল্লাহ’ নামক শিশুটির জীবন-ইতিহাসও আলীর চেয়ে বিন্দুমাত্র আলাদা ছিল না।
প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মানোর অপরাধে চার বছর আগে আলীর বাবা-মা তাকে মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে ফেলে রেখে নীরবে কেটে পড়ে। সেখান থেকে তাকে কুড়িয়ে নেয় আরেকজন অসহায় নারী। তবে তা ভালোবাসার টানে নয়, বরং অভিভাবকত্বের ছদ্মবেশে শুরু হয় অমানবিক শোষণ। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন আলী না পারতো হাঁটতে, না পারতো কথা বলতে। আর এই অসহায়ত্বকেই পুঁজি করে টানা চার বছর তাকে দিয়ে মাজার প্রাঙ্গণে ভিক্ষাবৃত্তি করানো হয়।
রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, ধুলাবালি আর মশা-মাছির কামড় সহ্য করে মাজারের মেঝেতেই কেটেছে অবুঝ শিশুটির জীবনের প্রতিটি দিন। প্রচণ্ড কনকনে শীতে শীতবস্ত্র ছাড়াই মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে একদিন আলীর পরনের শীতবস্ত্রটি তাকে উপহার দিয়েছিলাম।
তথাকথিত সেই অভিভাবক আলীকে ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আয় করলেও, শিশুর ন্যূনতম যত্ন নেয়নি। ছেঁড়া ও নোংরা পোশাক পরা থাকলে মানুষের সহানুভূতি বেশি পাওয়া যাবে এবং দান-খয়রাত বেশি মিলবে—এই হীন মানসিকতায় শিশুটিকে পরিচ্ছন্ন একটি পোশাক এমনকি শীতের পোশাক পর্যন্ত পরানো হতো না।
আবদুল্লাহ জীবনযুদ্ধে লড়াই করেছিল দুই বছর, আর আলী এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে টিকে ছিল চার বছর। চার বছর আগের তথাকথিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের দয়ার দৃষ্টি যেমন আলীর ওপর পড়েনি, তেমনি গত দুই বছরেও আবদুল্লাহর জন্য কারো মন গলেনি।
আসলে অসহায় মজলুমদের প্রতি দয়া কোনো কালেই হয়নি।
যে পথের মাঝখানে আলী এবং আবদুল্লাহ বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে ছিল, সেই পথ ধরেই প্রতিদিন হাজারো মানুষ খোদার দরবারে নামাজ পড়তে মসজিদে গেছেন, হাজারো মানুষ মাজার জিয়ারত করেছেন। কিন্তু পরম সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে অসহায় সৃষ্টি দুটোকে দেখে কারো হৃদয়ে বিন্দুমাত্র করুণা জাগেনি।
সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি যখন চোখের সামনে রাস্তায় পড়ে কষ্ট পায়, তাকে পেছনে ফেলে ধর্মালয়ে গিয়ে স্রষ্টাকে খোঁজার মধ্যে আদৌ কি কোনো সার্থকতা আছে? মানবতাহীন এই এবাদত কি সত্যিই আমাদের মুক্তি দিতে পারবে?

