জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও তথ্য বিক্রি করে কোটি টাকা আয়: নির্বাচন কমিশনের দুই কর্মচারী গ্রেফতার
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি ও সংবেদনশীল তথ্য অবৈধভাবে বিক্রি করে মাসে কোটি টাকার বেশি আয় করার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের এক কম্পিউটার অপারেটর কাম অফিস অ্যাসিস্টেন্টসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)-এর সাইবার ইনভেস্টিগেশনস অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিট গত বুধবার (১৪ জানুয়ারি ২০২৬) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন পৃথক এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— ১) মো. হাবীবুল্লাহ (৪১), পিতা মো. আব্দুস ছালাম, মাতা কুলসুম; স্থায়ী ঠিকানা চর উদয়পুর, শ্যামেরহাট, মেহেন্দীগঞ্জ, বরিশাল।
২) মো. আলামিন (৩৯), পিতা মোহাম্মদ আলী ফকির, মাতা আনোয়ারা বেগম; স্থায়ী ঠিকানা দড়িচর খাজুরিয়া, মেহেন্দীগঞ্জ, বরিশাল।
সিআইডি জানায়, প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি রাত ১০টা ৩০ মিনিটে আগারগাঁও নির্বাচন অফিস এলাকা থেকে মো. আলামিনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ জানুয়ারি রাত ১২টা ১০ মিনিটে (১৪ জানুয়ারির দিবাগত রাত) মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকা থেকে চক্রের অন্যতম সহযোগী মো. হাবীবুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মো. হাবীবুল্লাহ ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় কর্মরত থাকার পর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে বদলি হন। অন্যদিকে মো. আলামিন ২০১৬ সাল থেকে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর (আউটসোর্সিং) হিসেবে ঢাকার নির্বাচন কমিশন অফিসে কর্মরত ছিলেন।
মো. আলামিনের কাছে থাকা গোপনীয় আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে সারা দেশের এনআইডি তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ ছিল। সেই আইডি ও পাসওয়ার্ড তিনি মো. হাবীবুল্লাহকে সরবরাহ করতেন। এর বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে ৪-৫ হাজার টাকা উৎকোচ পেতেন তিনি।
সিআইডি জানায়, গোপন আইডি ব্যবহার করে মো. হাবীবুল্লাহ ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের সংবেদনশীল তথ্য বিক্রি করতেন। নির্বাচন কমিশনের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়—মাত্র এক সপ্তাহে ১ লাখ ১২ হাজার ১৫০টি এবং ৩০ দিনে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮টি এনআইডি তথ্য দেখা হয়েছে। প্রতিটি তথ্যের বিপরীতে ৩০০ টাকা হিসেবে হিসাব করলে প্রায় ১১ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকায় ফ্ল্যাটসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তোলেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
পল্টন মডেল থানায় দায়ের করা সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০ অনুযায়ী মামলায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উভয় আসামিই অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড আবেদনসহ পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বর্তমানে মামলার তদন্ত করছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। অবৈধ অর্থের উৎস শনাক্ত, চক্রের অন্যান্য সদস্যদের চিহ্নিত ও পুরো নেটওয়ার্ক উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Responses