প্রোভেন্সের পাহাড়ে শিল্পের ছোঁয়া: অ্যান্ডি গোল্ডসওয়ার্দির ভাস্কর্য আশ্রমে চার দিনের অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ ফ্রান্সের ওত-প্রোভেন্সে বিখ্যাত ল্যান্ড আর্ট শিল্পী অ্যান্ডি গোল্ডসওয়ার্দির শিল্পকর্ম পরিবেষ্টিত পাহাড়ি পথ ও আশ্রয়কেন্দ্রে ভ্রমণকারীদের এক অনন্য অভিজ্ঞতার বিবরণ।

Lifestyle ডেস্ক: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:০৫ পূর্বাহ্ন
দক্ষিণ ফ্রান্সের ওত-প্রোভেন্স অঞ্চলে পাহাড় আর প্রকৃতির বুক চিরে গড়ে তোলা হয়েছে এক অসাধারণ পদব্রজে ভ্রমণের পথ। প্রখ্যাত ল্যান্ড আর্ট শিল্পী অ্যান্ডি গোল্ডসওয়ার্দি ও স্থানীয় দলের প্রচেষ্টায় এই দুর্গম পাহাড়ি পথে পরিত্যক্ত রাখালদের কুঁড়েঘর, খামারবাড়ি, চ্যাপেল ও পাথরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে পুনর্নির্মাণ করে একেকটি শিল্পকর্মে রূপ দেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘ ট্রেকিং রুটে ভ্রমণের পাশাপাশি শিল্পের সান্নিধ্যে রাত কাটানোর সুযোগ রয়েছে।
উনেস্কো জিওপার্কের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ডিগনে-লে-বায়েঁ শহর থেকে শুরু হওয়া এই ট্রেকিং রুটটির মোট দৈর্ঘ্য ১৫০ কিলোমিটার। এটি ১০ দিনের একটি দীর্ঘ পথ, যেখানে সংরক্ষিত তবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য সাতটি অফ-গ্রিড থাকার আশ্রয়কেন্দ্র বা ‘রিফিউজ’ রয়েছে। সম্প্রতি চারজনের একটি দল চার দিনে ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এমনই তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে তাদের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন।
ভ্রমণটি শুরু হয় ডিগনে-লে-বায়েঁর মেসঁ আলেক্সান্দা ডেভিড-নেল জাদুঘর থেকে। ১৯২৪ সালে ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে তিব্বতের রহস্যময় শহর লাসায় প্রবেশকারী প্রথম পশ্চিমা নারী ছিলেন আলেক্সান্দা। এই জাদুঘর থেকেই পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর চাবি সংগ্রহ করতে হয়, যা ভ্রমণকারীদের মধ্যে এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের সূচনা করে।
যাত্রার প্রথম দিনেই দেখা মেলে ৩ মিটার পর্যন্ত উঁচু ডিম্বাকৃতির পাথরের তৈরি স্তূপের, যাকে বলা হয় ‘সেন্টিনেল’। কোনো প্রকার সিমেন্ট বা চুনকাম ছাড়া কেবল সঠিক ওজনের পাথর নিখুঁতভাবে সাজিয়ে এই ভাস্কর্যগুলো নির্মাণ করেছেন গোল্ডসওয়ার্দি। ফরাসি সরকার কর্তৃক প্রত্যয়িত ‘গ্রঁদে রঁদোনে’ চিহ্নিত পাহাড়ি পথ ধরে এগোনোর সময় পথের চারপাশের বিচিত্র বুনো ফুল এবং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন ভ্রমণকারীদের অভিভূত করে।
সূর্যাস্তের সময় ভ্রমণকারীরা তাদের প্রথম আশ্রয়কেন্দ্র ‘লা ফরেস্ট’-এ পৌঁছান। সেখানে এক অন্ধকাচ্ছন্ন কক্ষে প্রাকৃতিকভাবে আলোকিত একটি নলাকার পাথরের ভাস্কর্য রয়েছে। পাথর দিয়ে নির্মিত এই কাঠামোটির ওপরের ছিদ্র দিয়ে আকাশ দেখা যায় এবং দিনের আলো, আবহাওয়া ও ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এর ভেতরের দৃশ্যও পরিবর্তিত হয়। শিল্পকর্মটি যেন প্রকৃতির সাথে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
পরদিন ভ্রমণকারীরা নদীর তীরে বিশ্রাম শেষে দ্বিতীয় আশ্রয়কেন্দ্র ‘ল্য ভিয়েই এসক্লাঁগঁ’-এর দিকে যাত্রা করেন। এটি পাহাড়ের চূড়ার এক সবুজ প্রান্তরে অবস্থিত। এর দোতলার কক্ষে মেঝೆಯಿಂದ ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত শুকানো কাদা দিয়ে তৈরি একটি দীর্ঘ আঁকাবাঁকা ভাস্কর্য রয়েছে, যা নদীর প্রবহমানতার কথা মনে করিয়ে দেয়। ঘরের ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালালে আগুনের আলোয় ভাস্কর্যটি এক নতুন রূপ ধারণ করে।
তৃতীয় আশ্রয়কেন্দ্র ‘লা ফার্ম বেলন’-এ পৌঁছানোর পর নিচের তলায় দেখা যায় পাথরের তৈরি বিশাল কয়েকটি তোরণ বা আর্চ, যা মাটির ভেতর দিয়ে ড্রাগনের ভেসে যাওয়ার মতো মনে হয়। সেখানে রাত কাটানোর পরিকল্পনা থাকলেও ওপরের তলায় বাদুরের বসতি থাকায় ভ্রমণকারীরা কাছের এক বি অ্যান্ড বি-তে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ভ্রমণ শেষে পুনরায় ডিগনে-লে-বায়েঁ শহরে ফিরে তারা আশ্রয়কেন্দ্রের চাবি ফেরত দেন এবং গরম পানির ঝরনায় ক্লান্তি দূর করেন।
শিল্পী অ্যান্ডি গোল্ডসওয়ার্দির মতে, জাদুঘরে কয়েক মিনিটের জন্য কোনো শিল্পকর্ম দেখা আর সেটির ভেতরে কিছুদিন বসবাস বা ঘুমানোর মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কোনো শিল্পকর্মের ভেতরে ঘুমানো এক চমৎকার অনুভূতি। প্রকৃতি আর শিল্পের এই যুগলবন্দী হাইকারদের শারীরিক পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে এক নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা দেয়।
