POTHIKTV

যুক্তরাজ্যে ট্রাফিক স্ক্যানার ধ্বংস করছে ষড়যন্ত্রতত্ত্ববিদরা: নেপথ্যে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আতঙ্ক

যুক্তরাজ্যে ট্রাফিক সিগন্যালে বসানো যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী স্ক্যানার ধ্বংস করতে মাঠে নেমেছে ষড়যন্ত্রতত্ত্ববিদদের দল ‘ব্লেড রানার্স’। তাদের দাবি, এসব প্রযুক্তি নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে ট্রাফিক স্ক্যানার ধ্বংস করছে ষড়যন্ত্রতত্ত্ববিদরা: নেপথ্যে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আতঙ্ক

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে ট্রাফিক সিগন্যালে বসানো গাড়ি ও পথচারী পর্যবেক্ষণকারী স্ক্যানার বা সেন্সর কেটে ফেলার এবং ধ্বংস করার বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। নিজেদের ‘ব্লেড রানার্স’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া একটি দলের অনুসারী ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ববিদরা এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক চিত্রে দেখা গেছে, বয়স্ক নাগরিকরাও মই বেয়ে উঠে এসব স্ক্যানারের তার কেটে দিচ্ছেন।

গত ২৮ আগস্ট ডেভনের ইলফ্রেকম শহরের একটি শান্ত রাস্তায় ষাটোর্ধ্ব এক নারী ও সত্তোরোর্ধ্ব এক পুরুষকে ট্রাফিক লাইটের উপরের সেন্সর কাটতে দেখা যায়। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ক্ষতিসাধন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তবে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বিশ্বাসী সমর্থকদের কাছে তারা প্রশংসিত হচ্ছেন।

ইলফ্রেকম ছাড়াও ক্যামব্রিজ, স্লীফোর্ড এবং কাউন্টি ডারহামের মতো এলাকাগুলোতে একইভাবে প্রায় ২০০টির মতো ট্রাফিক ডিটেক্টর ইউনিট ধ্বংস করা হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে যুক্ত ব্যক্তিরা ট্রাফিক স্ক্যানারগুলোকে “ফেজড অ্যারেই ইলেকট্রনিক অ্যাসল্ট ওয়েপন” বা মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। তাদের দাবি, এগুলো দিয়ে গণ-নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং ক্যান্সার, ডিমেনশিয়া বা হঠাৎ মৃত্যুর মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করা হচ্ছে।

এর আগেও প্রযুক্তিবিরোধী এবং নজরদারির আতঙ্কে থাকা এই ধরনের কর্মীরা লন্ডনের আল্ট্রা লো এমিশন জোন (ইউলেজ) ক্যামেরা ধ্বংস করেছিল। এমনকি ৫জি মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ারগুলো করোনা ভাইরাস ছড়ায়—এমন ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে তারা সেগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।

ইউনিভার্সিটি অব লিডসের ইন্সটিটিউট ফর ট্রান্সপোর্ট স্টাডিজের প্রযুক্তি ও ইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুসান গ্রান্ট-মুলার এই বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ১৯৭০-এর দশকের শেষদিক থেকেই এই প্রযুক্তির প্রাথমিক রূপ ব্যবহার হয়ে আসছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, কর্মীরা মূল লাল, হলুদ বা সবুজ সিগন্যাল লাইট ধ্বংস করে না, বরং লাইটের ওপরে থাকা বাড়তি সেন্সরগুলো কেটে দেয়।

অধ্যাপক গ্রান্ট-মুলার আরও জানান, এই ট্রাফিক ক্যামেরাগুলো কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, মানুষের মুখ বা গাড়ির কোনো বিবরণ রেকর্ড করে না। এগুলো কেবল কোনো নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি বা মানুষের উপস্থিতি এবং তাদের অপেক্ষার সময় নির্ধারণ করে, যাতে ট্রাফিক প্রবাহ সহজ রাখা যায়। সাধারণত যানজট বেশি থাকা সংযোগস্থলগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধেই এসব স্ক্যানার বসানো হয়ে থাকে।

কিংসে কলেজ লন্ডনের সমসাময়িক সংস্কৃতির অধ্যাপক ক্লার বার্চাল বলেন, এই ধরনের বিশ্বাসগুলো মূলত “দ্য গ্রেট রিসেট” বা একটি বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে প্রচার করা হয়। মানুষ যখন প্রযুক্তিগত নজরদারি ও নিজেদের তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে, তখন তারা পরিস্থিতি বোঝাপড়ার জন্য এই ধরণের নিজস্ব বয়ান তৈরি করে নেয়।

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের কগনিটিভ সাইকোলজির অধ্যাপক স্টিফেন লেওয়ান্ডোস্কি ব্যাখ্যা করেছেন যে, যেকোনো ভীতিকর বা অনিয়ন্ত্রিত ঘটনার মুখোমুখি হলে কিছু মানুষ মনস্তাত্ত্বিক শান্তির জন্য ষড়যন্ত্রতত্ত্বে আশ্রয় নেয়। তাদের কাছে মনে হয়, অনিয়ন্ত্রিত কোনো ঘটনার চেয়ে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীকে দায়ী করতে পারাটা মানসিকভাবে স্বস্তিদায়ক।

অথেন্টিক সোর্স: The Guardian – Technology
0
0 comments·0 shares