POTHIKTV

রাত একটা বাজে। ঘড়ির কাঁটা নিজের শব্দ নিজেই গিলে খাচ্ছে। ঘরের ভেতর বাতাস স্থির, অথচ বুকের মধ্যে এক অদৃশ্য আগুন নড়াচড়া করছে। এই দহন কার, কোথা থেকে তার আগমন, তার কি কোনো ইতিহাস আছে? নাকি এই শূন্যতা জন্মেছে ঠিক এই মুহূর্তে, আমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে? শূন্যতা, তার কি শরীর নেই? সে কি কেবল অনুপস্থিতির নাম? যে […]

রাত একটা বাজে। ঘড়ির কাঁটা নিজের শব্দ নিজেই গিলে খাচ্ছে। ঘরের ভেতর বাতাস স্থির, অথচ বুকের মধ্যে এক অদৃশ্য আগুন নড়াচড়া করছে। এই দহন কার, কোথা থেকে তার আগমন, তার কি কোনো ইতিহাস আছে? নাকি এই শূন্যতা জন্মেছে ঠিক এই মুহূর্তে, আমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে?
শূন্যতা, তার কি শরীর নেই? সে কি কেবল অনুপস্থিতির নাম? যে এসে বসে থাকে বুকের মাঝখানে, গোপন এক সিংহাসনে। না পাওয়ার আক্ষেপ তার রাজদণ্ড। যা পাইনি, যা হতে পারিনি, যে নাম উচ্চারণ করতে পারিনি শেষবার, যে হাত ছুঁয়ে বলতে পারিনি থেকো—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সংসার গড়ে ওঠে ভেতরে। সেখানে আলো নেই, তবু অন্ধকারও অসম্পূর্ণ। এক আধো আলো, আধো অন্ধকারে আমি নিজেকেই চিনতে পারি না।
দীর্ঘদিনের চিঠি না পাওয়ার অভ্যাসে আমরা যেভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রতিরাতে দরজার নিচ দিয়ে খাম ঢুকে পড়ার শব্দ কল্পনা করি তেমনি বেঁচে থাকাও এখনকেবল অভ্যাসে পরিণিত হয়েছে। এই যে দহন, তা নিছক যন্ত্রণা নয়; এ এক স্থায়ী সহবাস। আগুনকে দূরে সরাতে গেলে সে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তাই তাকে নিয়ে চলাই কি শ্রেয় নয়? আগুনকে বুকের মধ্যে একটি প্রদীপ ভেবে নেওয়া যায় কি? যে পোড়ায়, সে-ই তো আলোকিতও করে।
উত্তর আধুনিকতার এই সময়ে আমি জানি, কোনো মহাকাব্যিক মুক্তি নেই। প্রভুর কাছে প্রার্থনাও এখন আর একরৈখিক নয়। আমি যখন বলি “তুমি তো জানো”, তখন আসলে কাকে বলি? ঈশ্বরকে, নাকি নিজের ভেতরের সেই নীরব সত্তাকে, যে সব জানে অথচ উচ্চারণ করে না? হয়তো প্রভু এক প্রতীক, হয়তো তিনি ভাষার ভেতরকার এক শূন্য স্থান, যেখানে আমি আমার অক্ষমতা জমা রাখি।
পথ তো সবসময় পায়ের নিচে। তবু এ অনন্তের পথ হাটি এক কদম, তারপর আরেক কদম। দহন নিয়েই হাঁটা যায়। কারণ আগুনও এক ধরনের শক্তি। তাকে যদি শত্রু ভাবি, সে আমাকে গ্রাস করবে। তাকে যদি স্বীকার করি, সে হয়তো আমার রাত্রিকে অর্থ দেবে।
রাত একটা পেরিয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, আমিও এগোই। শূন্যতা তখনও আছে, আক্ষেপও। কিন্তু তাদের নাম দিতে পারার মধ্যেই এক ধরনের মুক্তি আছে। ভাষা, শব্দ, উপমা—এসব দিয়ে আমরা আগুনকে স্পর্শ করি, তাকে রূপ দিই। আর রূপ পেলেই যন্ত্রণা আর কেবল যন্ত্রণা থাকে না; সে হয়ে ওঠে সাহিত্য, হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আরেকটি কৌশল।
হয়তো এভাবেই পারি দেওয়া যায় অনন্তের পথ। দহন বুকে নিয়েই। আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত, অনিশ্চিত, তবু অব্যাহত যাত্রায়।

3
4 comments·0 shares