লিটন হোসাইন জিহাদ: আমার শহরে কোনো ঘূর্ণিঝড় ছিল না। ছিল না কোনো রক্তপাত, ছিল না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা। শুধু তুমি এসেছিলে— নিঃশব্দে, নিরবধি, একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো। তোমার আগমনের দিন আকাশ স্বচ্ছ ছিল, বাতাস নরম। কিন্তু তার মধ্যেই আমার চারপাশের সবকিছু অস্থির হয়ে উঠলো। ঘড়ির কাঁটা হঠাৎ থেমে গেল, দেয়ালের ক্যালেন্ডার থেকে পাতাগুলো উড়ে গেল, আর আমি, আমি বুঝতে পারলাম— সময় যেন তোমার জন্য থেমে গেছে। তুমি আমাকে ভালোবাসা শিখিয়েছিলে, তবে সেই ভালোবাসা ছিল এক কালো যাদুর মতো— যে যেই ছুঁয়েছে, সে ফিরে যেতে পারেনি নিজের ভিতরে। আমি তখন…
লিটন হোসাইন জিহাদ: সৃষ্টি যখন প্রথম আলো জ্বালিয়েছিল অন্ধকারের বুক চিরে, তখন কেউ ছিলনা ডাকার জন্য, কেউ ছিলনা সাড়া দেওয়ার। তখন শব্দ ছিল না, ছিল না ভাষা। সময় তখনো নিজেকে চিনতে শেখেনি। স্থান ছিলো না, গতি ছিলো না, কিছুই ছিলো না Ñশুধু ছিল এক নিঃশব্দ প্রেম, যা আত্মার গভীরতম স্তর থেকে প্রস্ফুটিত হয়েছিল। সেই প্রেম কার প্রতি ছিল? কিসের প্রতি ছিল? সে কি স্রষ্টার নিজেরই ভেতরের এক তীব্র আকুলতা? হয়তো তিনি একা ছিলেন না, কারণ যিনি প্রেম ধারণ করেন, তিনি কখনো একা হন না। তিনি নিজের প্রেমেই পূর্ণ ছিলেন। সেই…
ফ্রিজে আটকে যাওয়া মা রাত আড়াইটায় ফ্রিজ খুললে মা বসে থাকে তাতে, চোখে টিফিন বক্সের মতো শীতল সংযম, হাত দিয়ে পাঁউরুটির পাশে ঠেলে দেয় বাবার ডায়াবেটিসের ওষুধ। "মা, তুমি এখানে?" —আমি বলি। মা উত্তর দেয় না। তাঁর ঠোঁট বরফের মতো জমে গেছে বহু বছর আগে— যেদিন রান্না করতে করতে হঠাৎ বলেছিল, "আজ আমি চুপ থাকব, একটু বেশি সময়ের জন্য।" তারপর কেটে গেছে ঈদ, জন্মদিন, ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ে— সব কিছু, আর ফ্রিজে জমেছে ব্যর্থ উৎসবের টুকরো স্মৃতি। মায়ের শরীরটা এখন ঘৃত কুমারীর বোতলের পাশে থাকে, মাঝে মাঝে লাইট জ্বলে উঠলে…
চানখারপুলের ওষুধের দোকানে প্রেমিকার চোখের জল বিক্রি হয়” লিটন হোসাইন জিহাদ ১ চানখারপুলের গলির মোড়ে, একটা ছোট ওষুধের দোকান, নাম— “স্বপ্নফার্মা” কিন্তু এখানে ঘুমের ওষুধের চেয়ে বেশি বিক্রি হয় অতীতের স্মৃতি, প্রেমিকার শেষ এসএমএস, আর না বলা কথার স্যালাইন। প্রেমিক দাঁড়িয়ে থাকে, হাতে একটা ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন— লেখা আছে ডাক্তারি ভাষায়: “Patient suffers from: Loss of Touch, Chronic Absence, Sudden Ghosting, & Emotional Hemorrhage.” ওষুধের দোকানি চশমা পরা একজন বৃদ্ধ, যিনি হাসেন না, শুধু বলেন— “ভালোবাসা এখন স্টকে নেই, তবে একটা চিঠি আছে, ভিজে গেছে বৃষ্টিতে… পড়বেন?” ২ চিঠির কাগজ…
শাড়ির ভেতর এক স্বপ্নের নারী” লিটন হোসাইন জিহাদ শাড়িতে তাকে অপারূপ লাগে— দুঃস্বপ্ন ভাঙার ঠিক আগ মুহূর্তে এক পরিত্যক্ত দেবদূতের ছায়া এসে আমার জানালায় কাঁপন তুলে বলে— "সে এসেছিলো... সেই নারী..." চুলে চাঁদের ঘ্রাণ, আর চোখে ঝরনার নীল, তার পায়ের চিহ্ন পড়ে না মাটিতে, সে হেঁটে চলে ঘুমের ভিতর, ফুলের গায়ে আলতো রেখা রেখে, ভালোবাসা লিখে দেয় পাতাহীন ডায়েরিতে। সে এক কোমল ভ্রম, তার হাসিতে গলে যায় লোহা, আয়নার পিঠ ফেটে সে বেরিয়ে আসে— আমার নিঃশ্বাসের অলিতে-গলিতে। তার শাড়িতে লেগে থাকে এক অলৌকিক গন্ধ— হয়তো জোনাকিদের মৃত্যু কিংবা বৃষ্টির প্রার্থনা,…
একটি গরিব লাশের জবানবন্দি লিটন হোসাইন জিহাদ আমার নাম কেউ রাখেনি, মাটি ডাকে “ওই গরিবটা” বলে— কোনো ভোটার তালিকায় ছিলাম না, তবু প্রতিটি নির্বাচনে মরে গেছি নির্ধারিতভাবে। আমি সে লাশ, যার মৃত্যুর আগে পোস্টমর্টেম হয়েছে। পেটের ভেতর রাষ্ট্রের পতাকা ছিল, আর খাদ্য তালিকায়—ধোঁয়া, ধোঁকা, দরকারি দুঃস্বপ্ন। আমার শেষ নিশ্বাসে ছিল পচা চালের গন্ধ, আর লোনের ফাঁদে বাঁধা বাবার আর্তনাদ। আমি মরে গেছি—তবু লাশটাকে নড়িয়েছে পুলিশ, কারণ আমার গায়ের রঙটা ভোটের পক্ষের ছিল না। আমার চোখ থেকে স্বপ্ন খুঁড়ে নিয়েছে একদল এনজিও, বলে দিয়েছে: “উন্নয়ন হচ্ছে—তোমার মৃতদেহই প্রমাণ।” আমি তালি বাজাই…