PATHIKTV VERIFY / FACT-CHECK REPORT
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে আসার দাবিতে অন্য প্রবাসীর কফিনের ভিডিও…
যাচাইয়ের ফলাফল
মিথ্যা
স্বজনেরা জানান, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম (২২)। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের দুজনকে গ্রেফতার করে দেশটির পুলিশ। এরপর তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব সরকার। নজরুলের মা জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রবিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় গত বুধবার। গণমাধ্যমের খবরে বুধবার ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকেই স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন; শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তারা। নজরুলের বাবা জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে যান। নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে তার আপন ফুফু বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কী করেছে আমি জানি না। একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই।’ এদিকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তার বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করছেন গ্রামবাসী। গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন বলেন, সৌদি আরব সরকার কট্টরনীতি থেকে উদারনীতির দিকে এগিয়ে গিয়ে সিনেমা হলসহ অনেক কিছু উন্মুক্ত করছে। অপরদিকে মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করছে। দেশটির আইন ও নীতিতেও সময়ের সঙ্গে কিছু সংশোধন আনা প্রয়োজন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তাতেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। দরিদ্র কৃষক পরিবারটি উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে নজরুলের স্বজনদের পাশে দাঁড়াতে দুই দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এলাকাবাসী। নজরুল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তিনি সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
Reliable evidence contradicts the central claim.যে দাবি করা হয়েছিল
যাচাইয়ে যা পাওয়া গেছে
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ভিডিওটির সূত্রের খোঁজ করতে গিয়ে Ahmed Didar নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলের খোঁজ পাওয়া যায়৷ এই প্রোফাইল থেকে ১৭ অক্টোবর দুপুর ১ টা ২৪ মিনিটে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও এবং ১৮ অক্টোবর সকাল ৯ টা ৫৩ মিনিটে দ্বিতীয় ভিডিও পোস্ট করা হয়৷ এসব ভিডিও আজ সকাল পর্যন্ত দেখা হয়েছে যথাক্রমে ৮১ হাজার ও ৮১ লক্ষ বার। গণমাধ্যমে মূলত দ্বিতীয় ভিডিওটি প্রচারিত হয়েছে।
আহমেদ দিদারের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি প্রায়ই বিমানবন্দরের ভিডিও প্রকাশ করে থাকেন৷
প্রথম ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে সেখানে দুই দফায় চারটি কফিন নিয়ে যেতে দেখা যায়। সেগুলো একে একে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছিল। এর মধ্যে কোন কফিনগুলো নজরুল-সিতির তা বলা হয়নি ভিডিওতে বা এর ক্যাপশনে। পরের ভিডিওটি মূলত প্রথম ভিডিওর পরের অংশ। এখানে দ্বিতীয় দফায় যে দুই কফিন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তা দেখানো হয়। এই কফিনগুলোকেই নজরুল-সিতির কফিন হিসেবে দাবি করে প্রচার চলছে ব্যাপকভাবে।
এই প্রতিবেদন লেখার সময় আহমেদ দিদার তার ভিডিওর ক্যাপশন বদলেছেন। প্রথম ভিডিওর ক্যাপশন ছিল, “সৌদি আরবে মসজিদে অনৈতিক কাজের দায়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশীর লাশ দেশে পৌঁছেছে”। এখন তা বদলে লেখা হয়েছে, “প্রবাসী ভাইয়ের লাশ।” দ্বিতীয় এবং ভাইরাল ভিডিওটির ক্যাপশনও বদলেছেন তিনি। আগের ক্যাপশন ছিল, “আজকে যদি নজরুল আর সিতি আমেরিকার নাগরিক হতো, সৌদি বাদশার বাপের সাধ্য ছিল ওদের শিরশ্ছেদ করার!? ‘মিসকিন’ দেশের বলে, জানানোরও দরকার মনে করেনি।” এখন সেটি বদলে লেখা হয়েছে, “সৌদি প্রবাসী ভাইয়ের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।” আজ সকালে এক পোস্টে এ বিষয়ে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। লিখেছেন, “সম্মানিত ফেইসবুক বন্ধুগন,গতকাল আমার আইডি থেকে পোস্ট করা একটি ভিডিও সারা দেশে ব্যপক ভাইরাল হয়েছে,ঐ ভিডিওর সাথে আমার দেওয়া ক্যাপশন ভুল ছিলো আমি সঠিক তথ্য না জেনে পোস্ট করায় সকলের কাছে ক্ষমা পার্থী।”
ভাইরাল ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে, ভিডিওতে মাছরাঙা টিভির একজন সাংবাদিককে বুম হাতে দেখা যায়। রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে মাছরাঙা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই সাংবাদিক লাশগুলোর বিষয়ে কিছু জানেন না।
পরে ভিডিওটি আরো বিশ্লেষণে একটি কফিন একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে দেখা যায়।
এই অ্যাম্বুলেন্সের সূত্রে ওই কফিনে থাকা লাশের পরিবারের সাথে যোগাযোগে সক্ষম হয় রিউমর স্ক্যানার৷ পিয়াস নামে ওই মৃতদেহের এক আত্মীয় রিউমর স্ক্যানারকে জানান, এই ঘটনা গত পরশু অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর আনুমানিক দুপুর ১ টার সময়ের।
পিয়াস জানান, সে সময় মোট সাতটি মরদেহের কফিন ছিল সেখানে। এর মধ্যে ছয়টি কফিন সৌদি আরব থেকে এসেছে, আরেকটি এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। সকাল আনুমানিক ১১ টার ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে কফিনগুলো আসে। ছয়টি লাশের একটি তার আত্মীয়ের।
পিয়াস বলছিলেন, তারা যখন কফিন নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছিলেন তখন সেখানে নজরুল-সিতি সম্পর্কিত কোনো আলোচনাই শোনেননি। বিমানবন্দরের পরিস্থিতি অন্যদিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল।
গত রাতে মূল ধারার গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নজরুলের বাবার একটি মন্তব্য পাওয়া যায়৷ তিনি বলেন, “আমার ছেলে কী করেছে আমি জানি না। একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই।”
রিউমর স্ক্যানারও আজ সকালে নজরুলের এক আত্মীয়ের সাথে কথা বলেছে। তিনি জানান, নজরুলের লাশ এখনও দেশে আসেনি।
বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে স্বজনদের বরাত দিয়ে বলা হয়, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম (২২)। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের দুজনকে গ্রেফতার করে দেশটির পুলিশ। এরপর তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব সরকার।
নজরুলের মা জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রবিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় গত বুধবার। গণমাধ্যমের খবরে বুধবার ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা।
সুতরাং, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে আসার দাবিটি মিথ্যা।
প্রেক্ষাপট ও সীমাবদ্ধতা
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
এদিকে, ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভুল তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নজরে এসেছে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে বিমানবন্দরে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। ভিডিওটি ব্যবহার করে দাবি করা হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
যেভাবে যাচাই করেছি
প্রমাণ ও তথ্যসূত্র
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে আসার দাবিতে অন্য প্রবাসীর কফিনের ভিডিও প্রচার
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে আসার দাবিটি সঠিক নয়।
তথ্যসূত্র দেখুন ↗
