অফস্টেডের নতুন পরিদর্শন ব্যবস্থা মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে: ব্রিটিশ প্রধান শিক্ষকদের অভিযোগ
যুক্তরাজ্যের অফস্টেডের নতুন স্কুল পরিদর্শন কাঠামো শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং কাজের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রধান শিক্ষকদের সংগঠন এনএএইচটি।

Education ডেস্ক: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:১৮ পূর্বাহ্ন
ইংল্যান্ডের অফস্টেডের (Ofsted) নতুন পরিদর্শন ব্যবস্থা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং এটি আগের কাঠামোর চেয়েও বেশি মানসিক চাপের সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ হেড টিচার্স (NAHT) সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, যেন অফস্টেড অবিলম্বে স্কুলগুলোকে গ্রেড দেওয়া বন্ধ করে।
লেবার সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধান শিক্ষক রুথ পেরির মৃত্যুর প্রেক্ষিতে নেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অফস্টেডের আগের ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ থেকে ‘ইনঅ্যাডিকেস’ পর্যন্ত হেডলাইন গ্রেডিং ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে নতুন ও বিস্তারিত একটি পরিদর্শন কাঠামো চালু করা হয়েছিল। তবে এনএএইচটি জানায়, প্রবর্তনের এক বছর পর এই নতুন ব্যবস্থা শিক্ষকদের আগের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন, বিপর্যস্ত এবং চরম হতাশ করে তুলছে।
শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েলকে দেওয়া একাধিক তথ্যে সংগঠনটি দেখিয়েছে কিভাবে এই নতুন কাঠামো শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে। বোল্টনের ক্লেপুল প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক অ্যামান্ডা হালমে জানান, তার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা ছিল সাম্প্রতিক এই পরিদর্শন। এর ফলে তার রক্তচাপ ও পালস রেট বেড়ে যায় এবং তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। এই অভিজ্ঞতার পর তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসরে যাওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।
অ্যামান্ডা হালমে আরও জানান, পরিদর্শনের প্রভাবে তার সহকর্মীদের অনেকেই এখন আর প্রধান শিক্ষকের পদে উন্নীত হতে চান না। এমনকি একজন শিক্ষক এই পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করছেন। নতুন ব্যবস্থায় ছয়টি বা তার বেশি মূল্যায়ন ক্ষেত্র যুক্ত হওয়ায় একটি স্কুলে নিম্ন গ্রেড পাওয়ার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এনএএইচটি-র জেনারেল সেক্রেটারি পল হোয়াইটম্যান সতর্ক করে বলেছেন, বিভিন্ন শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অফস্টেড কাঠামোটি পূর্বের ব্যবস্থার চেয়েও বেশি মানসিক যন্ত্রণাদায়ক। এটি স্কুল নেতা ও শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য তো বটেই, এমনকি জীবনধারণের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংগঠনটির কাছে আসা তথ্যে দেখা গেছে, অনেক প্রধান শিক্ষক পরিদর্শনের পর মানসিক কাউন্সিলিং নিতে বাধ্য হয়েছেন। পরিদর্শন চলাকালীন বা পরে প্রধান শিক্ষক ও স্টাফদের কান্নায় ভেঙে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার আগ পর্যন্ত সমস্ত অফস্টেড গ্রেডিং বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে এনএএইচটি, যদিও তারা সাধারণ পরিদর্শন চালু রাখার পক্ষে।
২০০২৩ সালে অফস্টেড পরিদর্শনের জেরে আত্মহত্যা করেছিলেন প্রধান শিক্ষক রুথ পেরি। পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, পরিদর্শনের চাপই তার আত্মহত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। এরপর থেকেই শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। অফস্টেড পরিদর্শকদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং পরিদর্শনের সময় প্রধান শিক্ষকদের মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে শিক্ষকদের অভিযোগ, এই খোঁজ নেওয়ার বিষয়টি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
রুথ পেরির বোন জুলিয়া ওয়াটার্স সম্প্রতি জানান, অফস্টেড পরিদর্শনের কারণে অন্তত এক ডজন শিক্ষক আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন বা আত্মঘাতী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে চিঠি দিয়ে এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। এর পর শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল ওয়াটার্সের সঙ্গে বৈঠকে সম্মত হয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী পাওয়েল বলেন, তিনি প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। স্কুলগুলোর মান উন্নয়নে জবাবদিহিতার একটি কাঠামো থাকা প্রয়োজন, তবে সরকার এমন একটি ব্যবস্থা দেখতে চায় যা শিক্ষকদের কাজের প্রতি আরও বেশি সহায়তামূলক এবং সহানুভূতিশীল হবে।
অন্যদিকে অফস্টেড দাবি করেছে, অনেক প্রধান শিক্ষক তাদের জানিয়েছেন যে বর্তমান পরিদর্শন প্রক্রিয়াটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সহযোগিতামূলক এবং গঠনমূলক মনে হচ্ছে। নতুন পরিদর্শনের কার্যকারিতা নিয়ে নিরপেক্ষ ধারণা দিতে তারা শিগগিরই একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে।
