জৈব অস্ত্র ও নজরদারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করল অ্যানথ্রোপিক
অ্যানথ্রোপিকের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ব্যবহার করে ক্ষতিকর জৈব জীবাণু তৈরি, মিসাইল ও বোমা ডিজাইন এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারির চেষ্টার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে।

প্রযুক্তি ডেস্ক: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মারাত্মক সব ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার চেষ্টার চাঞ্চল্যকর বিবরণ প্রকাশ করেছে এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ১৫৪ পৃষ্ঠার একটি থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অপরাধী, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত দল, স্পাইওয়্যার বিক্রেতা, বিজ্ঞানী এবং প্রোপাগান্ডা রচয়িতারা তাদের শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করে রাসায়নিক ও জৈব উপাদান, মিসাইল এবং বোমা ডিজাইনসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারির চেষ্টা চালিয়েছে।
অ্যানথ্রোপিক তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এটি কোনো সাধারণ অপব্যবহারের ঘটনা নয়, বরং তাদের শনাক্ত করা এযাবৎকালের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও নতুন ধরনের হুমকি। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, গ্রাহকদের কাছে তাদের দেওয়া সেবার এমন অপব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ করা তারা নিজেদের দায়িত্ব মনে করে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জৈব গবেষণায় এআই মডেলের অপব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীদের পাঁচটি নির্দিষ্ট কেস স্টাডি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। অ্যানথ্রোপিক জানায়, এসব ক্ষেত্রে গবেষকরা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তাদের অবস্থান গোপন করেন এবং যে অঞ্চলগুলোতে সেবা পাওয়ার সুবিধা নেই, সেখানকার নিরাপত্তা দেয়াল টপকে কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তারা নিজেদের কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্যও গোপন রেখেছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সীমান্ত বা ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলগুলোর অন্যতম গুরুতর ঝুঁকি হলো এর জৈবিক অপব্যবহার। সঠিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকলে এমন সক্ষমতা চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ ঘটনাগুলোর পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে অ্যানথ্রোপিক। তবে গবেষকদের মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হওয়ায় তাদের নাম, সংশ্লিষ্ট দেশের পরিচয় বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়, রাশিয়ার হয়ে চালানো সাইবার স্পাইং, দ্রুত তথ্য চুরির মতো সাইবার হামলা, নজরদারি এবং অপপ্রচারমূলক কর্মকাণ্ডেও ক্লাউড (Claude) এআই মডেল ব্যবহারের চেষ্টা চলেছে। যেমন চীনে সিরিয়ায় অবস্থানরত উইঘুরদের ওপর নজরদারি এবং রাশিয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ইরান ও বাংলাদেশে চালানো অপপ্রচার অভিযানের কথা এতে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ইয়েমেন, চীন ও রাশিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র, মিসাইল, সশস্ত্র ড্রোন ও বোমার মতো প্রথাগত অস্ত্রের সফটওয়্যার তৈরিতে এআই ব্যবহারের চেষ্টা দেখা গেছে।
জৈব গবেষণার একটি উদাহরণে বলা হয়, এক বিজ্ঞানী মশা বাহিত রোগ ‘চিকুনগুনিয়া’ ভাইরাসের ওপর রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে অনুদানের আবেদন তৈরিতে ক্লাউড এআই ব্যবহার করেন। ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কয়েক মাস ধরে তীব্র ব্যথা ও জ্বর হতে পারে। এমন গবেষণা একদিকে যেমন ভ্যাকসিন তৈরিতে কাজে লাগতে পারে, তেমনি অন্য দিকে এটি জৈব অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। একটি সামরিক গবেষণা ইনস্টিটিউটে এ সংক্রান্ত পড়াশোনা চলছিল বলে এ নিয়ে তারা বেশ উদ্বিগ্ন ছিল।
অ্যানথ্রোপিকের একজন সাবেক কর্মী জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করার মাত্র দুদিন পরই রিপোর্টটি প্রকাশ করা হলো। জ্যাকব অভিযোগ করেন, অ্যানথ্রোপিক এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই এক দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রতিযোগিতায় মেতেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তবে অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলছেন, দূরবর্তী ভবিষ্যতের কল্পিত কোনো বিপর্যয়ের চেয়ে আগামী তিন বছরের মধ্যে এআইয়ের বাস্তব জীবনের হুমকিগুলো অনেক বেশি চিন্তার বিষয়।
প্রতিষ্ঠানটি জোর দিয়ে বলেছে, সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকা এই ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধে কেবল একা কাজ করলে চলবে না। এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা বাড়াতে এবং অপব্যবহার প্রতিরোধে পুরো শিল্প খাত ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সূত্র: The Guardian – Technology





