তীব্র দাবদাহে হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়: এনএইচএসের ইতিহাসে ব্যস্ততম গ্রীষ্ম
গ্রীষ্মকালীন পাঁচটি তীব্র দাবদাহের কারণে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। জরুরি বিভাগ, অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং ১৮৮ হেল্পলাইনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সেবাপ্রার্থীর রেকর্ড তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য ডেস্ক: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:৩৪ পূর্বাহ্ন
গ্রীষ্মকালীন পাঁচটি তীব্র দাবদাহের ধাক্কায় যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) চরম চাপের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গরম মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নজিরবিহীন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে রেকর্ড তাপমাত্রা বাড়ার পর ইংল্যান্ডের জরুরি বিভাগ (এ অ্যান্ড ই), অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং এনএইচএস ১১১ পরামর্শ লাইনে সেবা নেওয়ার হার আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এনএইচএস ইংল্যান্ডের সর্বশেষ পারফরম্যান্স পরিসংখ্যানে এই চিত্র উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জরুরি পরিস্থিতির কারণে এনএইচএস এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। শীতকালের পাশাপাশি এখন গ্রীষ্মকালেও চিকিৎসা সেবার চাহিদা চরম মাত্রায় পৌঁছানোয় স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় থাকছে না।
কিং’স ফান্ড নামের স্বাস্থ্য বিষয়ক থিংকট্যাংকের প্রধান নির্বাহী সারাহ উলনফ জানান, চরম তাপমাত্রা এখন কেবল আবহাওয়ার খবর নয়, এটি এনএইচএসের ওপর বড় এক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনএইচএস এখন জোড়া সংকটের মুখে পড়েছে, যেখানে শীতের সাথে সাথে গ্রীষ্মও সেবার প্রধান চাপ হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে এবং রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ নিয়মিত হওয়ায় মানুষের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসে ইংল্যান্ডের এ অ্যান্ড ই ইউনিটগুলোতে প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন, যা যেকোনো গ্রীষ্ম মৌসুমের জন্য সর্বোচ্চ। এনএইচএস ইংল্যান্ড জানিয়েছে, মোট ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪৫ জন রোগী জরুরি বিভাগে এসেছেন, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২ লাখ ৪০ হাজার বেশি। এমনকি ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি গ্রীষ্মে প্রায় ১০ লাখ বেশি মানুষ জরুরি বিভাগে এসেছেন।
এনএইচএসের অন্যান্য জরুরি সেবাদানেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। এই গ্রীষ্মে রেকর্ড ২৪ লাখ ৬০ হাজার অ্যাম্বুলেন্স কল পাওয়া গেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৩ লাখ ২০ হাজার। এছাড়া এনএইচএস ১১১ হেল্পলাইন গ্রীষ্মের মাসগুলোতে ৩০ লাখের বেশি কল রিসিভ করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১ লাখের বেশি।
এনএইচএস ইংল্যান্ডের জাতীয় মেডিকেল ডিরেক্টর প্রফেসর ফ্রাঙ্কি সোর্ডস জানান, তীব্র খরতাপের এই গ্রীষ্মে সেবা নেওয়ার চাহিদা রেকর্ড পরিমাণ বাড়লেও স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের সেবাদানে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব ইভেট কুপার স্বীকার করেছেন যে, তীব্র তাপমাত্রা এনএইচএসের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং অতিরিক্ত সেবার চাহিদা এখন আর কেবল শীতকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি ঘোষণা দেন, নতুন অপারেশন থিয়েটার, শিশুদের ওয়ার্ড, উন্নত মাতৃত্বকালীন ইউনিট নির্মাণ এবং তীব্র গরম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এনএইচএস ফান্ড থেকে ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করা হবে।
তবে যুক্তরাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য ও সামাজিক যত্ন বিভাগ (ডিএইচএসসি) জানিয়েছে, ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দের মধ্য থেকে হাসপাতালগুলোকে অতি-উত্তাপ বা গরম প্রতিরোধ উপযোগী করার জন্য মাত্র ৩২ মিলিয়ন পাউন্ড রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি তীব্র গরম মোকাবিলায় এনএইচএসকে সহায়তা করতে ডিএইচএসসি একটি ‘হিট টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে।
অ্যাজমা প্লাস লাং ইউকে দাতব্য সংস্থার বহিরাগত বিষয়ক পরিচালক অ্যান্ড্রিউ ম্যাকক্র্যাকেন জানান, আগস্ট মাস বিশ্বজুড়ে যৌথভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত মাস ছিল এবং এর প্রভাব সরাসরি দেশের হাসপাতালগুলোতে দেখা গেছে। ইংল্যান্ডে জরুরি ভর্তির পেছনে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাই মূল কারণ এবং এই গ্রীষ্মে রোগী বৃদ্ধির পেছনে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে।
ম্যাকক্র্যাকেন ব্যাখ্যা করেন, তাপমাত্রা বাড়লে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ওপর দাবানলের ধোঁয়া, অতিরিক্ত বায়ুচাপের ফলে আটকে থাকা দূষণ এবং দীর্ঘায়িত পরাগরেণুর ঋতু ফুসফুসের জটিলতায় ভোগা রোগীদের জন্য বড় সংকট তৈরি করে।
অন্যদিকে, সরকারের জন্য আরও উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, জুলাই মাসে ইংল্যান্ডে হাসপাতালের অপেক্ষমাণ তালিকা বেড়ে ৭৩ লাখে পৌঁছেছে, যা গত অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। এই বৃদ্ধির ফলে ২০২৯ সালের মধ্যে অপেক্ষমাণ তালিকার ৯২ শতাংশ মানুষকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসার আওতায় আনার সরকারি প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সূত্র: The Guardian – Health






