ব্লুবেরি ও কলা দিয়ে স্মুদি বানালে কি পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়? বিশেষজ্ঞদের মতামত
ব্লুবেরির সঙ্গে কলা মিশিয়ে স্মুদি তৈরি করলে তা ব্লুবেরির অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পুষ্টিগুণ কমিয়ে দেয়—একজন বায়োমেডিকেল সায়েন্টিস্টের এমন দাবির পর তা নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীরা।

স্বাস্থ্য ডেস্ক: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:০৬ পূর্বাহ্ন
কলা ও ব্লুবেরি একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা স্মুদি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় একটি পানীয়। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পডকাস্টে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবি নিয়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বায়োমেডিকেল সায়েন্টিস্ট ড. রোন্ডা প্যাট্রিক এক পডকাস্টে দাবি করেছেন যে, ব্লুবেরি স্মুদিতে কলা যোগ করলে ব্লুবেরির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে পুষ্টিবিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এই বিষয়ের প্রভাব খুবই সামান্য এবং এটি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।
ড. রোন্ডা প্যাট্রিকের মতে, কলায় পলিমার বা যৌগ ভাঙতে সক্ষম ‘পলিফেনল অক্সিডেজ’ নামক একটি এনজাইম বা পাচক রস থাকে। অন্যদিকে ব্লুবেরিতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ বা পলিফেনল থাকে। তিনি দাবি করেন, কলায় থাকা এই এনজাইম ব্লুবেরির পলিফেনল ভেঙে ফেলে, যার ফলে শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না।
এই দাবির পেছনে ২০২৩ সালের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়। যেখানে দেখা গিয়েছিল, কলার স্মুদির সঙ্গে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্ল্যাভানল গ্রহণকারীদের রক্তে এই উপাদানের উপস্থিতি অন্যান্য ফ্রুট স্মুদি গ্রহণকারীদের তুলনায় কম ছিল। তবে ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অফিস ফর সায়েন্স অ্যান্ড সোসাইটির পরিচালক ড. জো শোয়ার্ৎস জানান, ওই গবেষণায় মাত্র আটজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যা থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। এছাড়া ওই গবেষণায় সরাসরি ব্লুবেরি ও কলা একসঙ্গে মিশিয়ে পরীক্ষা করা হয়নি।
ড. শোয়ার্ৎস আরও জানান, ব্লুবেরিতে থাকা সবচেয়ে প্রধান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হলো ‘অ্যান্থোসায়ানিন’, যা ব্লুবেরির রঙের জন্য দায়ী এবং হৃদরোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু ওই গবেষণায় ব্লুবেরির প্রধান উপাদান অ্যান্থোসায়ানিন পরিমাপই করা হয়নি; বরং পরিমাপ করা হয়েছিল কোকো থেকে নেওয়া ফ্ল্যাভানল। মজার বিষয় হলো, ওই গবেষণাটির অর্থায়ন করেছিল মার্স (Mars) নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যারা কোকো ও ফ্ল্যাভানল সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করে।
খাদ্য পুষ্টিবিদদের মতে, খাবারে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরস্পর মিথস্ক্রিয়া খুব সাধারণ একটি ঘটনা। যেমন ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণে সাহায্য করে, আবার পালং শাকের অক্সালেট উপাদান ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। তবে মিনিয়াপোলিসের নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান অ্যালিসা নর্থরপ জানান, একটি উপাদানের মিথস্ক্রিয়া নিয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাস নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ঠিক নয়। সারাদিনে পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি খাওয়া নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, কলা স্মুদিকে প্রাকৃতিক মিষ্টতা দেওয়ার পাশাপাশি এটি ঘন ও সুস্বাদু করে তোলে। এছাড়া কলায় পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম ও আঁশ বা ফাইবার থাকে। অন্যদিকে পলিফেনল সমৃদ্ধ খাবার হৃদযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখতে সাহায্য করলেও, এটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান হিসেবে বিবেচিত নয় এবং এর দৈনিক নির্দিষ্ট চাহিদার মাত্রা নির্ধারণ করা নেই।
যদি কেউ স্মুদিতে ব্লুবেরির সর্বোচ্চ পুষ্টি বজায় রাখা নিয়ে অতিমাত্রায় চিন্তিত থাকেন, তবে তিনি কলার বদলে আম বা আনারস ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া স্মুদি ঘন করার জন্য দই, ওটস, সিল্কেন টফু, অ্যাভোকাডো কিংবা বরফ করা ফুলকপিও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামগ্রিক স্বাস্থ্য কেবল স্মুদিতে কলা দেওয়া বা না দেওয়ার ওপর নির্ভর করে না; বরং বৈচিত্র্যময় ফলমূল খাওয়া ও সক্রিয় জীবনযাপনই আসল চাবিকাঠি।
সূত্র: The Guardian – Health
