মার্শাল আর্ট থেকে এআই সাম্রাজ্য: সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাইখ তাহনুন যেভাবে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে
মার্শাল আর্ট অনুরাগী 'বেন' থেকে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক—সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শাইখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের বহুমুখী জীবন ও ক্ষমতার উত্থান।

অনুসন্ধান ও বিশেষ প্রতিবেদন ডেস্ক: ২ অক্টোবর ২০২৬, ৭:০৪ পূর্বাহ্ন
১৯৯৩ সালের ১২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে আয়োজিত প্রথম আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপে (ইউএফসি) ব্রাজিলীয় রয়স গ্রেসির জয় সরাসরি দেখছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে বসবাসকারী এক বিনয়ী ছাত্র। সেই লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি স্থানীয় একটি মার্শাল আর্ট একাডেমিতে যান এবং ‘বেন’ ছদ্মনামে ব্রাজিলিয়ান জিউ-জিতসু প্রশিক্ষণ শুরু করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফিরে যান, তখন সহপাঠীরা জানতে পারেন শান্ত স্বভাবের এই তরুণ আসলে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা শাইখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের সন্তান শাইখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
আজ সেই শাইখ তাহনুন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও শীর্ষ স্পাইমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য তদারকি করছেন। এই বিশাল অর্থনৈতিক তহবিলের পরিমাণ ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্কের মতো বড় অর্থনীতির মোট জিডিপির সমতুল্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক রূপান্তরে তাহনুনের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। তিনি দেশটির বৃহত্তম সার্বভৌম বিনিয়োগ তহবিল, ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংক এবং জলবায়ু বিনিয়োগ তহবিল ‘আলটেরা’ পরিচালনায় যুক্ত। এছাড়া তিনি রাজপরিবারের মূল বিনিয়োগ মাধ্যম ‘রয়েল গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার সম্পদ মূল্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাজ্যের থেমস ওয়াটার থেকে শুরু করে স্কটল্যান্ডের উইন্ডফার্ম এবং যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে তার পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠানের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে।
বর্তমানে শাইখ তাহনুন বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। মাইক্রোচিপ কারখানা, সুবিশাল ডাটা সেন্টার এবং তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক ডিজিটাল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের শীর্ষপর্যায়ের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক নেতাদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
তাহনুনের উত্থানের শিকড় রয়েছে তার পারিবারিক পটভূমিতে। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রথম শাসক শাইখ জায়েদের সন্তান তাহনুন ও তার সহোদররা ‘বনি ফাতিমা’ (ফাতিমার সন্তান) নামে পরিচিত। তার মা ফাতিমা আল কেতবির প্রভাবেই এই ভাইয়েরা দেশের অন্যতম ক্ষমতাধর গোষ্ঠীতে পরিণত হন। পারিবারিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে তারা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনোভাবের জন্য পরিচিত তাহনুন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ‘এজ অফ এম্পায়ার্স’ ভিডিও গেমসে জেতার জন্য তিনি গেম ডেভেলপারকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ‘হাইড্রা’ নামক সুপারকম্পিউটার তৈরিতে অর্থায়ন করেন, যা তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা দাবারু হিসেবে গ্র্যান্ডমাস্টারদের পরাজিত করে। প্রতিযোগিতায় জয়ের এই প্রবণতা তিনি পরবর্তী সময়ে অর্থায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালনায় প্রয়োগ করেন।
তবে অর্থনৈতিক সাফল্য ও প্রভাবের পাশাপাশি তাহনুনের তদারকিতে থাকা নিরাপত্তাবেষ্টনী নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরোধী মতামত দমন এবং গোপন আটকের বিষয়ে অভিযোগ তুলে আসছে। ২০১৮ সালে গবেষণা সফরে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ব্রিটিশ গবেষক ম্যাথিউ হেজেস দাবি করেছিলেন যে, দীর্ঘ সাত মাস তাকে একাকী বন্দি রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সেখানে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদিও ২০২৩ সালে আমিরাত সরকার এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানায় যে, হেজেসকে যথাযথ যত্ন প্রদান করা হয়েছিল এবং কোনো ধরনের অমানবিক আচরণ করা হয়নি।
কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার না দেওয়া এবং সব সময় পর্দার আড়ালে অবস্থান পছন্দ করা শাইখ তাহনুনকে অনেকেই রহস্যময় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেন। তাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও প্রশংসা উভয়ই থাকলেও, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি খাকে তার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।





