POTHIKTV

মার্শাল আর্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্রাজ্য: কে এই শেখ তাহনুন?

মার্শাল আর্টের অনুরাগী থেকে শুরু করে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের অজানা জীবন ও বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের গল্প।

মার্শাল আর্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্রাজ্য: কে এই শেখ তাহনুন?

অনুসন্ধান ও বিশেষ প্রতিবেদন ডেস্ক: ২ অক্টোবর ২০২৬, ৭:১৮ পূর্বাহ্ন

১৯৯৩ সালের ১২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারে আয়োজিত প্রথম আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপে (ইউএফসি) ব্রাজিলিয়ান জিউ-জিতসু যোদ্ধা রয়েস গ্রেসি ডাচ কিকবক্সার জেরার্ড গর্ডোকে পরাস্ত করেন। পে-পার-ভিউতে এই লড়াই সরাসরি দেখছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে বসবাসকারী এক নীরব মধ্যপ্রাচ্যীয় শিক্ষার্থী। এই প্রতিযোগিতা দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি স্থানীয় একটি মার্শাল আর্টস একাডেমিতে ভর্তি হন এবং নিজের নাম পরিচয় গোপন করে ‘বেন’ নামে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন।

সেই শান্ত এবং নিয়মানুবর্তী শিক্ষার্থী ‘বেন’ আর কেউ নন, তিনি ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্য শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। নব্বইয়ের দশকে সান ডিয়েগোতে গোপনে মার্শাল আর্টের তালিম নেওয়া এই ব্যক্তি পরবর্তীতে জিউ-জিতসুতে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন এবং নিজের শিক্ষক নেলসন মন্তেইরোকে সঙ্গে নিয়ে আবুধাবিতে ফিরে আসেন। আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং একজন পরাক্রমশালী গোয়েন্দা প্রধান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের প্রিয় স্ত্রী ফাতিমা আল কেতবির সন্তান তাহনুন এবং তার ভাইদের একত্রে ‘বনি ফাতিমা’ বা ফাতিমার সন্তান বলা হয়। ২০০৪ সালে শেখ জায়েদের মৃত্যুর পর আবুধাবির ক্ষমতার শীর্ষে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেন এই ভাইয়েরা। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা না হওয়ায় সিংহাসনের সরাসরি উত্তরাধিকারী না হলেও তাহনুনকে তার বাবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও প্রাসাদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখান থেকেই তিনি ১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে ‘রয়েল গ্রুপ’ নামে এক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার।

বর্তমানে শেখ তাহনুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং দেশটির শীর্ষ অর্থলগ্নিকারী। আবুধাবির মূল সার্বভৌম তহবিল, ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংক এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবায়ু বিনিয়োগ তহবিল ‘আলতেরা’ তিনি পরিচালনা করেন। যুক্তরাজ্যের টেমস ওয়াটার থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, রিয়েল এস্টেট, রিয়েল মাদ্রিদের স্পন্সরশিপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে তার ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। তিনি যে বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য তদারকি করেন তার মোট মূল্য প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্কের মোট জিডিপির সমান।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও শেখ তাহনুন বেশ কৌশলী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ‘এজ অব এম্পায়ারস’ ভিডিও গেমসে নিজের ভাইদের হারানোর জন্য তিনি একজন গেম ডেভেলপারকে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দাবা খেলায় জয়ের জন্য তিনি ‘হাইড্রা’ নামের একটি সুপারকম্পিউটার তৈরিতে অর্থায়ন করেন, যা তৎকালীন সময়ের বেশ কয়েকজন গ্র্যান্ডমাস্টারকে পরাজিত করেছিল। বর্তমানে তিনি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের অন্যতম বড় অর্থদাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আবুধাবির খলিফা পোর্টের কাছে গড়ে উঠছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআই ডাটা সেন্টার।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হলেও প্রচারবিমুখ থাকতে পছন্দ করেন। তিনি গণমাধ্যমে কখনোই আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দেন না এবং তার সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদের কঠোর গোপনীয়তার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক একসময় তাহনুনের ২৫০ মিলিয়ন ডলারের সুপারইয়েটে দেখা করে বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে স্কটল্যান্ডের উইন্ডফার্ম কিংবা টেক্সাসের মহাকাশযান প্রকল্পে তার বিনিয়োগের প্রভাব বিস্তৃত।

তবে শেখ তাহনুনের এই ক্ষমতার অন্ধকার দিকও রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভ্যন্তরে ভিন্নমত দমন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের ওপর নজরদারির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নানা তথ্য তুলে ধরেছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের একাডেমিক গবেষক ম্যাথিউ হেজেস সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আটক হন এবং দীর্ঘ সাত মাস নির্জন কারাবাসে থাকেন। যদিও ২০২৩ সালের এক সরকারি বিবৃতিতে আমিরাত সরকার এসব নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, হেজেসকে সম্পূর্ণ যথাযথ পরিচর্যা দেওয়া হয়েছিল।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনে শেখ তাহনুনের ভূমিকা যেমন অপরিসীম, তেমনি দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীদের অনেকেই গোপনে অভিযোগ করেন যে রাজপরিবারের এই বিশাল অর্থনৈতিক আধিপত্যের সামনে বেসরকারি খাত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। নীরবে থেকে বিশ্বজুড়ে নিজেদের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছেন এই আমিরাতি রাজপুত্র।

অথেন্টিক সোর্স: The Guardian – The Long Read
0
0 comments·1 share

সম্পর্কিত সংবাদ

এই বিভাগের উল্লেখযোগ্য সংবাদ

অনুসন্ধান ও বিশেষ প্রতিবেদন →