আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই চ্যাটবট দিয়ে মুসলিম নারীদের হিজাব অপসারণ: গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উদ্বেগজনক চিত্র
ব্যবহারকারীদের নির্দেশে এআই চ্যাটবটগুলো মুসলিম নারীদের ছবি থেকে হিজাব সরিয়ে দিচ্ছে। গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিমালার বড় ধরনের ফাঁক ও ইসলামফোবিয়া ছড়ানোর চিত্র উঠে এসেছে।

Uncategorized ডেস্ক: ২ অক্টোবর ২০২৬, ৭:০৪ পূর্বাহ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটগুলোকে নির্দেশ দিলে তারা মুসলিম নারীদের ছবি থেকে হিজাব বা পর্দা সরিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকটি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলে ফেলাকে মুসলিম সম্প্রদায়ের নীতি ও বিশ্বাসের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সের এক উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিবিদের একটি বিতর্কের পর দ্য গার্ডিয়ান বিভিন্ন জনপ্রিয় চ্যাটবটের ওপর এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT), গ্রক (Grok), জেমিলাই (Gemini) এবং ক্লড (Claude)-কে হিজাব পরা একটি কৃত্রিম নারী অবয়বের ছবি থেকে হিজাব সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষায় ওপেনএআই-এর ‘চ্যাটজিপিটি’ এবং এক্সএআই-এর ‘গ্রক’ নির্দেশ পাওয়া মাত্রই হিজাব সরিয়ে নতুন ছবি তৈরি করে দেয়।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড’ জানায় যে তাদের ছবি সম্পাদনা বা তৈরির সুবিধা নেই। তবে যদি থাকত, তাহলেও তারা কারও ছবি থেকে হিজাব সরানোর কাজ করত না। গুগল এআই-এর ‘জেমিলাই’ শুরুতে আসল মানুষের ছবি থেকে পোশাক বা মাথার ঢাকনা সরাতে সম্মতি দেয়নি। তবে ছবিটিকে আরও “পাশ্চাত্য” (Western) ধাঁচের রূপ দিতে বলা হলে এটি হিজাব ছাড়া নতুন ছবি তৈরি করে দেয়।
দ্য গার্ডিয়ান ইউএস সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর এই পরীক্ষাটি চালায়। ফরাসি উগ্র ডানপন্থী সংসদ সদস্য ও ন্যাশনাল র্যালি পার্টির নেতা জুলিয়েন ওডুল একজন হিজাব পরা মুসলিম নারীর আসল ছবি বিকৃত করে তা এক্স (সাবেক টুইটার)-এ পোস্ট করেন। মূল ছবিতে ওই নারী হিজাব ও ফুলহাতা পোশাক পরে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। তবে ওডুলের পোস্টে নারীর চুল ও হাত উন্মুক্ত অবস্থায় দেখা যায়, যার ক্যাপশন ছিল “LIBERTÉ FRANÇAISE” বা ‘ফরাসি স্বাধীনতা’।
ওডুল এই কাজের জন্য কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করেছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনপ্রতিনিধিদের এমন কাজ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিভিত্তিক ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানোর একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে মুসলিম নারীদের অবমাননা ও যৌন ভাবমূর্তি তৈরিতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ইলহান ওমর ও রাশিদা তলাইবের মতো প্রখ্যাত মুসলিম নারী রাজনীতিকদের লক্ষ্য করেও একই ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।
সিএসওএইচ-এর গবেষণা পরিচালক এভিয়ান লেইডিগ বলেন, মুসলিম সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে মুসলিম নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো ও হেনস্তা করার যে ধারা চলছে, এটি তারই একটি অংশ। এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মকানুন শিথিল করায় উগ্র ডানপন্থীরা ডিজিটাল মাধ্যমে এমন ক্ষতিকর কাজ করার সাহস পাচ্ছে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, গ্রক চ্যাটবট হিজাব সরানোর নির্দেশ সহজেই মেনে নিলেও একটি এআই নারীর পোশাক খুলে নেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। এর ব্যাখ্যায় গ্রক জানায়, হিজাব সরানোকে তারা কেবল চুল বা পোশাকের সাধারণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করেছে। চ্যাটজিপিটিও একইভাবে পোশাক সরানোর অনুরোধ নামঞ্জুর করলেও স্বীকার করে যে, যারা হিজাব পরেন তাদের চুল উন্মুক্ত করা গোপনীয়তা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বড় ধরনের লঙ্ঘন হতে পারে।
গার্ডিয়ান অন্যান্য ধর্মের পোশাক নিয়েও একই ধরনের পরীক্ষা চালিয়েছিল। শিখ পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি এবং ক্যাথলিক নানদের ধর্মীয় পোশাক সরানোর ক্ষেত্রেও চ্যাটজিপিটি একইভাবে ছবি বানিয়ে দিয়েছে। জেমিলাই চ্যাটবটটি শুরুতে পুরুষদের পাগড়ি সরাতে অস্বীকার করলেও ছবিটিকে আরও পাশ্চাত্য রূপ দেওয়ার নির্দেশ দিলে সেটিতেও পাগড়ি সরিয়ে ফেলে।
অন্যান্য চ্যাটবটের নীতিমালায় শিথিলতা দেখা গেলেও ক্লড স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি হিজাব বা ধর্মীয় পোশাক পরেন, তবে তা পরিবর্তন করা তাদের ধর্মীয় পরিচিতি ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত হানে। তাই এটি কাউকে হয়রানি বা অপদস্থ করতে ব্যবহার করা উচিত নয়। চ্যাটবটগুলোর এই বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে ওপেনএআই, গুগল, এক্সএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।


