ফরাসি বন্ড বাজারে ধস: ইউরোপীয় ঋণের সংকট ও ইউরোর মানের ওপর নতুন চাপ
ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি বন্ড বাজারে ধস নেমেছে, যা ১৫ বছর আগের ইউরো অঞ্চলের ঋণ সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবে ইউরোর মান কমেছে ১৭ মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

Business ডেস্ক: ২ অক্টোবর ২০২৬, ৭:১৮ পূর্বাহ্ন
ইউরোপের সরকারি বন্ড বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের রাজকোষ ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে দেশটির সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র রূপ নিয়েছে যে তা ১৫ বছর আগের ইউরো অঞ্চলের ঋণ সংকটের স্মৃতিকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে।
ফ্রান্স ও জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হারের ব্যবধান বেড়ে ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের (ওএটি) সুদের হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ স্তরে লাফিয়ে ওঠে, যদিও পরবর্তীতে তা সামান্য কমেছে। বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ড বিক্রির প্রবণতার মধ্যে ফ্রান্সের ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পুরো ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ডয়েচে ব্যাংকের কৌশলবিদ জিম রিড উল্লেখ করেছেন যে, ফ্রান্স ও জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের ব্যবধান একদিনে ১৩.৯ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ মহামারীর চরম মুহূর্তের পর এটিই একদিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। চতুর্থ প্রান্তিকের শুরুতে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই ধরনের ঘটনাকে অনেকেই ইউরোপীয় ঋণ সংকটের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন।
ফ্রান্সের রেকর্ড পরিমাণ সরকারি ঋণ এবং ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা বন্ড কিনতে দ্বিধাবোধ করছেন। বর্তমানে দেশটির জাতীয় ঋণ মোট জিডিপির ১১৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ফরাসি সরকার বাজেট ঘাটতি কমাতে ৪ হাজার ৩০০ কোটি ইউরো মূল্যের ব্যয় সংকোচন ও কর বৃদ্ধির প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেসকিউর জানান, ঘাটতি কমানোর মাধ্যমে দেশকে সঠিক পথে ফেরানো অত্যন্ত জরুরি। নতুন বাজেটে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো, পেনশন বৃদ্ধি সীমিত করা এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে সীমা আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই ব্যবস্থার পরও আগামী বছর ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশে থেকে যাবে, যা সরকারি ঋণ বৃদ্ধিতে লাগাম টানার জন্য যথেষ্ট নয়।
আইএনজি-র বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি হয়তো আগামী বছর ৬.৫ শতাংশে পৌঁছানো থেকে রক্ষা পাবে, কিন্তু এটি জাতীয় ঋণকে স্থিতিশীল করতে পারবে না। সামনে জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কারণে ফরাসি বন্ডগুলো বেশ কিছু দিন চাপের মুখে থাকতে পারে এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও এখনই তৈরি হয়নি।
ফ্রান্সের এই সংকটের প্রভাব পড়েছে একক মুদ্রা ইউরোর ওপর। একক মুদ্রাটির মান ০.৭৫ শতাংশের বেশি কমে ১.১২১৪ ইউরোতে নেমেছে, যা ১৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। সুইসকোটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইপেক ওজকারদেসকায়া জানিয়েছেন, ইউরো অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় ফ্রান্সের ঋণের দুর্বলতা সমগ্র ইউরো অঞ্চলে আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যেও সরকারি ঋণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের আর্থিক নীতি বজায় রাখার যে ‘ফিসক্যাল বাফার’ ছিল, তা কমে অর্ধেক হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থনীতিবিদ লর্ড ও’নিল পরামর্শ দিয়েছেন যে, অতিরিক্ত কর না বাড়িয়ে বর্তমান আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাজেট বাফার ছোট রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর জল্পনা অর্থনীতিকে আরও অস্থির করে তুলছে।






